মো. বাইজিদ শেখ

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল), বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়, যার মাধ্যমে আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন আজ ২৮ এপ্রিল দৃশ্যমান বাস্তবতা। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের খবর। আজ মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ বা ‘নিউক্লিয়ার নেশন’-এর মর্যাদাপূর্ণ ক্লাবে প্রবেশ করল। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে ১৬৩টি ইউরেনিয়াম বান্ডেল স্থাপন করার কাজ শুরু হয়েছে, যা সম্পন্ন করতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগবে। একসময় সন্ধ্যে নামলেই বাংলার গ্রামে গ্রামে জ্বলে উঠত কুপি আর হারিকেনের নিভু নিভু আলো। লোডশেডিংয়ের চরম ভোগান্তিতে স্থবির হয়ে থাকত জনজীবন। সেই অন্ধকার পেরিয়ে আজকের আলোকিত বাংলাদেশ মাঝখানে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। বর্তমানে শতভাগ বিদ্যুতায়নের এই দেশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আগামীর দিকে তাকাই, তখন আমাদের চোখের সামনে স্বপ্নের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালকসহ রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই অর্জন প্রমাণ করে, বাংলাদেশ এখন আর পিছিয়ে পড়া কোনো দেশ নয়; বিশ্বের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও আমাদের হাতের মুঠোয়। বাস্তবতার নিরিখে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও আয়ুষ্কাল, রূপপুরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা। পত্রিকার পাতা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই কেন্দ্রটি চালু হলে এর স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল হবে ৬০ বছর। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে এর আয়ু আরও ৩০ বছর বাড়িয়ে ৯০ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাওয়া সম্ভব। বাস্তবতা হলো, অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো এখানে প্রতিদিন তেল, গ্যাস বা কয়লা কেনার কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। চুল্লিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে টানা দেড় বছর বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। দেড় বছর পর পুরো জ্বালানি একসঙ্গে পরিবর্তন না করে কেবল এক-তৃতীয়াংশ বদলালেই চলবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির দাম চরম অস্থিতিশীল, সেখানে রূপপুর আমাদের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বিশাল ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।

অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ: শঙ্কা বনাম সম্ভাবনা, যেকোনো মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রেই আবেগের পাশাপাশি বাস্তব অর্থনৈতিক হিসাব মেলানো জরুরি। ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। শুরুতে প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ ৬ টাকা ধরা হলেও, সংবাদমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, বর্তমান বাস্তবতায় এই দাম ১২ টাকার কাছাকাছি পড়তে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এটি কিছুটা ব্যয়বহুল মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং পরিবেশগত সুবিধার কথা বিবেচনা করলে এটি লাভজনক। এখান থেকে উৎপাদিত ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হবে সম্পূর্ণ কার্বনমুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ একাই পূরণ করবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও কঠোর নিরাপত্তা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার স্মৃতি থেকে শঙ্কা তৈরি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ আমাদের মাটি ও মানুষের নিরাপত্তা সবার আগে। তবে বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখলে ভয়ের কোনো কারণ নেই। রূপপুরে ব্যবহার করা হচ্ছে রাশিয়ার সর্বাধুনিক ‘থ্রি-প্লাস জেনারেশন’ (VVER-1200) রিঅ্যাক্টর। এই প্রযুক্তিতে রয়েছে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয়। এমনকি কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিমান দুর্ঘটনা ঘটলেও এর মূল অবকাঠামো সুরক্ষিত থাকবে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও রাশিয়ার সাথে চুক্তি থাকায় পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি নেই। সব মিলিয়ে এটি তৃতীয় প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তির অন্যতম নিরাপদ মডেল হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃত। আগামীর ভবিষ্যৎ: জাতীয় গ্রিডে সংযুক্তির অপেক্ষা, আজকের এই জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে তাপ উৎপাদন শুরু হবে এবং তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে টারবাইন ঘুরাবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্ট মাসের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। আর চলতি বছরের শেষ বা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় (১২০০ মেগাওয়াট) উৎপাদনে যাবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে প্রযুক্তিনির্ভর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে আমাদের প্রয়োজন এই রূপপুরের মতো নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ। এই কেন্দ্র চালু হলে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ সমগ্র বাংলাদেশের শিল্প খাতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটবে। দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ আসবে, গড়ে উঠবে ভারী শিল্প কারখানা এবং লাখো বেকারের কর্মসংস্থান হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কোনো রূপকথার গল্প নয়, এটি আজ আমাদের ঘামে, শ্রমে ও সদিচ্ছায় নির্মিত এক জ্বলন্ত বাস্তবতা। পদ্মার বুকে যেমন পদ্মা সেতু আমাদের আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক, তেমনি পদ্মার তীরে রূপপুর আমাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও নিরাপদ আগামীর প্রতীক। আগামী দিনগুলোতে যখন এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, তখন আলোকিত হবে দেশের প্রতিটি কোণ। হারিকেনের আলো থেকে নিউক্লিয়ার শক্তির এই উত্তরণ ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায় হয়েই থাকবে, যা পথ দেখাবে আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশকে।

লেখক: শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।