জাফর আহমাদ
কিয়ামতের দিন দু’ধরনের শোভাযাত্রা হবে। এক, জান্নাতের শোভাযাত্রা, দুই, জাহান্নামের শোভাযাত্রা। আল কুরআন থেকে জানা যায়, যারা দুনিয়ায় কোন জাতির বা দলের নেতৃত্ব দেয় কিয়ামতের দিনও তারাই তাদের নেতা হবে।
জান্নাতের দিকে শোভাযাত্রা : যদি তারা দুনিয়ায় নেকী, সততা ও সত্যের পথে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে তাহলে এখানে যারা তাদের অনুসরণ করেছে তারা কিয়ামতের দিনও তাদেরই পতাকাতলে সমবেত হবে এবং তাদের নেতৃত্বে জান্নাতের দিকে এগিয়ে যাবে।
জাহান্নামের শোভাযাত্রা : আর যদি তারা দুনিয়ায় কোন ভ্রষ্টতা, নৈতিকতা বিরোধী কার্যকলাপ ও এমন কোন পথের দিকে মানুষকে আহবান জানিয়ে থাকে যা সত্য দীনের পথ নয়, তাহলে যারা এখানে তাদের পথে চলেছে তারা সেখানেও তাদেরই পেছনে থাকবে এবং তাদের নেতৃত্বে জাহান্নামের দিকে এগিয়ে যাবে। হাদীসে নবী সা: থেকেও এই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায়: “কিয়ামতের দিন কবি ইমরাউল কয়েসের হাতে থাকবে জাহেলী কাব্যচর্চার ঝাণ্ডা এবং আরবের জাহেলিয়াত পন্থ’ী সমস্ত কবি তার নেতুত্বে জাহান্নামের পথে এগিয়ে যাবে।”
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “কিয়ামতের দিন সে নিজের কওমের অগ্রবর্তী হবে এবং নিজের নেতৃত্বে তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে। অবস্থানের জন্য কেমন নিকৃষ্ট স্থান সেটা।” (সুরা হুদ : ৯৮)
এ দু’ধরনের শোভাযাত্রা কোন ধরনের জৌলুস ও জাঁক জমকের সাথে তাদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাবে তার চিত্র এখন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের চিন্তা ও কল্পনার পটে এঁকে নিতে পারে। এখান থেকেই নির্ধারণ করতে হবে কাল আখিরাতে তাকে কোন শোভাযাত্রায় কার নেতৃত্বে অংশ গ্রহণ করতে হবে। যেসব নেতা দুনিয়ার জীবনে নিজেরা গোমরাহ এবং মানুষদেরকে হরহামেশা গোমরাহ করছে। মানুষকে সত্য বিরোধী পথে পরিচালিত করেছে, তাদের অনুসারীরা যখন নিজেদের চোখে দেখে নেবে এ জালেমরা কি ভয়াবহ পরিণতির দিকে তাদেরকে টেনে এনেছে। তখন তারা নিজেদের সমস্ত বিপদ-মুসীবতের জন্য তাদেরকে দায়ী মনে করবে এবং তাদের শোভাযাত্রা তাদেরকে নিয়ে এমন জাহান্নামের দিকে রওয়ানা দেবে যে, আগে আগে তাদের নেতারা চলবে এবং তারা পেছনে পেছনে তাদেরকে গালি দিতে দিতে এবং তাদেও প্রতি লালন বর্ষণ করতে করতে চলতে থাকবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর তাদের ওপর এ দুনিয়ায় লানত পড়েছে এবং কিয়ামতের দিনও পড়বে। কত নিকৃষ্ট প্রতিদান সেটা, যা কেউ লাভ করবে!” (সুরা হুদ : ৯৯) কারণ দুনিয়ার জীবনে এরা সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ এদের ওপর সর্বদা লানত করেছে।
ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, নেতা-নেত্রীদের নেতৃত্বে জাহান্নামের দিকে যাত্রার আগে আল্লাহ তা’আলা মহান আদালতে এ সমস্ত নেতা-নেত্রী ও তাদের অনুসারীদের বিচার কার্য শুরু হবে। সেখানে শুনানীর প্রাক্কালে নেতা-নেত্রীরা তাদের অনুসারীদের অস্বীকার করবে। দুনিয়ায় যে সকল ক্ষমতাগর্বী নেতা-নেত্রী থাকবে, যাদের অঙ্গুলীর নির্দেশে তার চ্যালা বা অনুসারীরা উঠ-বস করতো তারা সেদিন অর্থাৎ আল্লাহর আদালতে তাদের কর্মীবাহিনীকে অস্বীকার করবে। তাদেরকে আমরা আমাদের দলে ডেকে আনিনি বরং এরা নিজেরাই সামান্য হালুয়া-রুটির জন্য আমাদের পেছনে পেছনে ঘুরতো। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “ক্ষমতাগর্বীরা সেই দমিত লোকদেরকে বলবে, “তোমাদের কাছে যে সুপথের দিশা এসেছিল তা থেকে কি আমরা তোমাদেরকে রুখে দিয়েছিলাম? বরং তোমরা নিজেরাই তো অপরাধী ছিলে।” (সুরা সাবা : ৩২) অর্থাৎ তারা সেদিন বলবে, আমাদের কাছে এমন কোন শক্তি ছিল না যার সাহায্যে আমরা মাত্র গুটিকয় মানুষ তোমাদের মত কোটি কোটি মানুষকে জোরপুর্বক নিজেদের আনুগত্য করতে বাধ্য করতে পারতাম। যদি তোমরা ঈমান আনতে চাইতে তাহলে আমাদের নেতৃত্ব, মাতাব্বুরি ও শাসন কর্তৃত্ব ও সিংহাসন উল্টে ফেলে দিতে পারতে। আমাদের সকল কু-কাজের লাঠিয়াল বা সেনাবাহিনী তো তোমরাই ছিলে। আমাদের শক্তি, মাস্তানি ও সম্পদের উৎস তো ছিল তোমাদের হাতে। তোমরা অবৈধ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমিদখল-এর ভাগ যদি না দিতে, তাহলে তো আমরা বিত্তহীনই থাকতাম। তোমরা যদি আমাদের আনুগত্য না করতে, তাহলে আমাদের নেতাগিরি একদিনও চলত না। কোন মুরীদ যদি কোন পীরের বাইয়াত না হতো তাহলে তার পীরালী একদিনও চলত না। তোমরা জিন্দাবাদের শ্লোগান না দিলে কেউ আমাদের কথা জিজ্ঞেসও করত না। তোমরা আমাদের লাঠিয়াল বাহিনী না হলে সাধারণ জনগণ আমাদের সমীহ করতো না। সত্যিকারার্থে যারা রাসুলের অনুসারী হিসাবে তোমাদের সামনে যে পথ পেশ করেছিলেন তোমরা নিজেরাই নিজেদের দুনিয়ার স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের পথে চলতে চাওনি। তোমরা ছিলে স্বার্থ ও প্রবৃত্তির দাস। আর তোমাদের প্রবৃত্তির চাহিদা তাদের দেখানো পথে না গিয়ে তোমরা আমাদের চামচাগিরি করেছো। তোমরা হালাল ও হারামের পরোয়া না করে দুনিয়াবী আয়েশ ও আরামের প্রত্যাশী ছিলে এবং আমাদের কাছেই তার সন্ধান পাচ্ছিলে। তোমরা এমন সব পীরের সন্ধানে ছিলে যারা তোমাদের সব রকমের পাপ কাজ করার ব্যাপক অনুমতি দিত এবং সামান্য কিছু নজরানা নিয়ে তোমাদের পাপ মোচনের দায়িত্ব নিজের মাথায় তুলে নিতো। তোমরা এমন সব নেতা-নেত্রী পেয়েছিলে যারা প্রত্যেকটি কু-কাজ আকাজের দায়ভার থেকে তোমাদের খেয়াল-খুশি মতো উদ্ধার করে দিতো। তোমাদের এমন নেতার প্রয়োজন ছিল যারা পরকাল সমৃদ্ধ হোক বা বরবাদ হয়ে যাক তার পওরোয়া না করে যে কোনভাবেই হোক না কেন তোমাদের দুনিয়াবী স্বার্থ উদ্ধার করে দিতে পারলেই যতেষ্ট। তোমাদের এমন সব শাসকের প্রয়োজন ছিল যারা নিজেরাই হবে অসচ্ছরিত্র এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তোমরা সব রকমের গোনাহ ও অসৎ কাজ করার অবাধ সুযোগ লাভ করবে। এভাবে আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান সমান লেনদেনের কথা হয়েছিল। এখন তোমরা এ কেমন ভড়ং সৃষ্টি করে চলেছো, যেন তোমরা বড়ই নিরপরাধ এবং আমরা জোর করে তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিলাম।
দমিত অনুসারী যারা সত্যিকারার্থে একটু হালুয়া-রুটির জন্য এ সমস্ত নেতা-নেত্রীদের পা চাটাচাটি করতো এবং এদের ছত্র-ছায়ায় সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতো। সন্ত্রাস, রাহাজানি, মারামারি, চাঁদাবাজি ও জবরদখল করার পাশাপাশি খুনখারাপিও করতো। এদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারণে সমাজে বিভিষিকাময় অরাজকতা সৃষ্টি হতো। এদের খুঁটির জোর ছিল সে সমস্ত নেতা-নেত্রীরা, যারা এদেরকে মূলত: ক্ষমতার জন্য ব্যবহার করতো। এ সমস্ত অনুসারীরা সেদিন আল্লাহর আদালতে কি বলবে, তা আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “সেই দমিত লোকেরা ক্ষমতাগর্বীদেরকে বলবে,“না বরং দিবারাত্রের চক্রান্ত ছিল যখন তোমরা আমাদের বলতে আমরা যেন আল্লাহর সাথে কুফুরী করি এবং অন্যদেরকে তাঁর সমকক্ষ উপস্থাপন করি। শেষ পর্যন্ত যখন তারা আযাব দেখবে তখন মনে মনে প্রস্তাতে থাকবে এবং আমি এ অস্বীকারকারীদের গলায় বেড়ী পরিয়ে দেবো। লোকেরা যেমন কাজ করেছিলো তেমনি প্রতিদান পাবে, এ ছাড়া আর কোন প্রতিদান কি তাদেরকে দেয়া যেতে পারে?” (সুরা সাবা : ৩৩) শেষ পর্যন্ত এই নেতা-নেত্রী ও তাদের অনুসারীরা দলে দলে জাহান্নমের দিকে এগিয়ে যাবে। দুনিয়ায় যারা তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেদিন জাহান্নামের দিকে যাত্রার নেতৃত্বও তারাই দিবে।
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “আর এরা যখন সবাই একত্রে আল্লাহর সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে, সে সময় এদের মধ্য যারা দুনিয়ায় দুর্বল ছিল তারা যারা নিজেদেরকে বড় বলে জাহির করতো তাদেরকে বলবে, “দুনিয়ায় আমরা তোমাদের অনুসারী ছিলাম, এখন কি তোমরা আল্লাহর আযাব থেকে আমাদের বাঁচাবার জন্যও কিছু করতে পারো? তারা জবাব দিবে, “আল্লাহ যদি আমাদের মুক্তি লাভের কোন পথ দেখাতেন তাহলে আমরা নিশ্চয়ই তোমাদেরও দেখিয়ে দিতাম। এখন তো সব সমান, কান্নাকাটি করো বা সবর করো-সর্বাবস্থায় আমাদের বাঁচার কোন পথ নেই।” (সুরা ইবরাহিম : ২১) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “যেদিন তাদের চেহেরা আগুন ওলট পালট করা হবে তখন তারা বলবে, “হায়! যদি আমরা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করতাম”। আরো বলবে, “হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছে। হে আমাদের রব! তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দাও এবং তাদের প্রতি কঠোর লানত বর্ষণ করো।” (সুরা আহযাব : ৬৬-৬৮) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “তারপর একটু চিন্তা করে দেখো সে সময়ের কথা যখন এসব লোক দোযখের মধ্যে পরস্পর ঝগড়ায় লিপ্ত হবে। যারা দুনিয়ায় দুর্বল ছিল তারা সেসব লোকদের বলবে যারা নিজেদের বড় মনে করতো, “আমরা তো তোমাদের অনুসারী ছিলাম। এখন এখানে কি তোমরা আমাদেরকে জাহান্নামের কষ্টের কিছু অংশ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করবে?” বড়ত্বের দাবীদাররা বলবে: আমরা সবাই এখানে একই অবস্থায় আছি। আর আল্লাহ তার বান্দাদের ব্যাপারে ফায়সালা করে দিয়েছেন।” (সুরা মু’মিন : ৪৭-৪৮)
অন্যদিকে যাদের নেতৃত্ব ছিল সৎ ও মানবতার কল্যাণের পক্ষে। রাত দিন নিজেদের সুখ-শান্তিকে পেছনে ফেলে তাদের সাধনাই ছিল কিভাবে মানুষের জীবনে সুখ ও শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়। এমন সমাজ গঠন করা যায় যেখানে সমাজের প্রতিটি সদস্য ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। এ জন্য তারা মানুষকে সৎ কাজে উৎসাহ উদ্দীপনা দান করতেন এবং অসৎ ও অন্যায় কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য সামাজিক পরিশুদ্ধতার কাজ করতেন। তাদের নেতৃত্ব মানুষকে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতের অধিকারী করবে তাদের অনুসারীরা নিজেদের শুভ পরিণাম দেখে তাদের নেতাদের জন্য দোয়া করতে থাকবে এবং তাদের ওপর প্রশংসা ও শুভেচ্ছার পুস্প বর্ষণ করতে করতে এগিয়ে যাবে।
লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।