প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে সভ্যতা সংঘাতপূর্ণ। কারণ, আলো-আঁধারের সহাবস্থান বাস্তবসম্মত নয়। বিষয়টি বহুমাত্রিক হলেও আস্তিক্যবাদ, নাস্তিক্যবাদ ও বস্তুবাদের মধ্যে সংঘাতটা বেশ জোরালো। আস্তিক্যবাদ (Theism) হল এমন বিশ্বাস যা অন্তত একজন স্রষ্টা বা উপাস্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করে। বহুত্ববাদ হল বহুসংখ্যক স্রষ্টায় বিশ্বাস। বস্তুত ইসলাম ও খ্রিষ্টবাদ একেশ্বরবাদী। যদিও খ্রীষ্টধর্মের বিকৃতরূপ হচ্ছে ত্রিত্ববাদ। আস্তিক্যবাদের বিপরীত অবস্থানই হল নাস্তিক্যবাদ। নাস্তিক্যবাদে একক বা একাধিক কোন রকম স্রষ্টাকেই স্বীকার করা হয় না। তাদের বিবেচনায় যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয় তার কোন অস্তিত্ব নেই। নাস্তিক্যবাদে সম্পূর্ণ ভৌত এবং প্রাকৃতিক উপায়ে প্রকৃতির ব্যাখ্যা করা হয়। আস্তিক্যবাদের বর্জনই হলো নাস্তিক্যবাদ। মূলত নাস্তিক্যবাদী চিন্তা-চেতনাই বিশ্বকে সংঘাতপূর্ণ করে রেখেছে সে আবহমান কাল থেকেই। কারণ, এর ধারক-বাহকরা অতিমাত্রায় অসহিষ্ণু।

বস্তুবাদ (Materialism) হলো দর্শনের প্রাথমিক মতবাদগুলোর একটি। বস্তুবাদে সবই বস্তু দ্বারা গঠিত। এটি ভাববাদের বিরোধী এবং বস্তুবাদীদের সংগ্রামই ঐতিহাসিক-দার্শনিক প্রক্রিয়ায় আবদ্ধ। বস্তুবাদ কথাটি সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রধানত বস্তু সম্বন্ধে পদার্থবিদ্যাগত ধারণাগুলীর অর্থে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে তা ব্যবহৃত হয়েছে দার্শনিক অর্থে, ভাববাদের বিপরীতে।

আস্তিক্যবাদ আর নাস্তিক্যবাদের মধ্যে সংঘাতটা সৃষ্টির সূচনা থেকেই। আস্তিক্যবাদীদের দাবি হচ্ছে নাস্তিক্যবাদীরা চিরন্তন সত্যকে অস্বীকার এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সেতুবন্ধন রচনার পরিবর্তে বিভেদ সৃষ্টি করে। যা এক ধরনের উন্নাসিকতা ও আত্মপ্রবঞ্চনা বৈ কিছু নয়। পক্ষান্তরে নাস্তিক্যবাদীদের দাবি আস্তিক্যবাদীরা বাস্তবতাবিবর্জিত, আবেগ ও অনুমান নির্ভর। তাদের দাবি বিজ্ঞান ও দর্শনের সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আর যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক তা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে একশ্রেণির বিজ্ঞানী এ বিতর্কের একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এতদিন মনে করা হতো যে ধর্ম ও আধুনিক বিজ্ঞান পরস্পর বিরোধী। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের কিছু গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক মতবাদ এমন দাবির সাথে একাত্ম হতে পারেনি বরং এসব গবেষণাপত্রে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অবলীলায় স্বীকার করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘সায়েন্স এন্ড দি স্পিরিচুয়েল কোয়েস্ট’ কনফারেন্সের রিপোর্ট প্রকাশ করতে গিয়ে নিউজ উইক ২০ জুলাই সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে একেবারে ঘোষণা দিয়েই বলেছে ‘বিজ্ঞান ঈশ্বর তথা স্রষ্টা খুঁজে পেয়েছে’।

কনফারেন্সে উপস্থিত কয়েকশ’ বিজ্ঞানী ও থিওলজিয়ান সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয়েছেন যে, বিজ্ঞান ও ধর্ম ক্রমশ একাকার হয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ এলিস তাঁর বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘বিপুল পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত স্রষ্টার অস্তিত্ব সমর্থন করছে’।

নিউজ উইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আধুনিক বিজ্ঞানের ক্রমশ অগ্রগতির ফলে মনে হতে পারে যে ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের বিরোধ বাড়ছে এবং ধর্মের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমে যাচ্ছে’। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ বিশ্বাস ক্রমেই প্রসার লাভ করছে যে, এসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত শক্ত করছে এবং স্রষ্টার অস্তিত্বের সপক্ষেই ইঙ্গিত দিচ্ছে’। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘পদার্থবিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে পারছেন যে, প্রাণ ও চেতনার বিকাশ সাধনের জন্য মহাবিশ্ব একজন স্রষ্টার হাতেই বিশেষভাবে তৈরি হয়েছে’। প্রতিবেদনে বিগ ব্যাঙ, জ্যোতির্বিদ্যা, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, ক্যায়োস থিওরি সব কিছুকেই বলা হচ্ছে ‘ঈশ্বরের এক একটি প্রবেশ পথ-যা দিয়ে প্রবেশ করে ঈশ্বর এ পৃথিবীতে কাজ করেন’।

একশ্রেণির বিজ্ঞানী স্রষ্টার অস্তিত্ব ও শক্তিমত্তাকে স্বীকার করে নিলেও বিষয়টি নিয়ে উন্মুক্ত চিন্তা-চেতনার দাবিদার নাস্তিক্যবাদীদের তা পছন্দ হয়নি। যদিও বিশ্বাসী মানুষরা এ বিশ্বকে আস্তিক্যবাদী বিশ্বে পরিণত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে তারা নানা ধরনের বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছেন। অপর দিকে নাস্তিক্যবাদীরা পৃথিবীকে বানাতে চায় নাস্তিক্যবাদের অভয়ারণ্য হিসেবে। এমনকি ক্ষেত্রে বিশেষে আস্তিক্যবাদী তৎপরতাকে কোনঠাসা করার জন্যই নাস্তিক্যবাদীদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। এভাবেই উভয় পক্ষের দ্বন্দ্বেই পৃথিবী নতুন করে হয়ে উঠেছে অশান্ত ও সংঘাতপূর্ণ। এজন্য নাস্তিক্যবাদীদের অসহিষ্ণু ও কর্তৃত্ববাদী মানসিকতাই অনেকাংশে দায়ি।

দীর্ঘদিন আগের কথা। একদিন অফিসে এক অচেনা ভদ্রলোক আসলেন। জানালেন তিনি নওগাঁ থেকে এসেছেন আমার সাথে কথা বলার জন্য। তিনি তার রাজনৈতিক পরিচয়ও জানালেন। একটি বাম রাজনৈতিক দলের নওগাঁ জেলার সেক্রেটারি। যতদূর মনে পড়ে নাম ‘মুকুল’। তাকে স্বাগত জানিয়ে স্বপ্রতিভভাবেই বললাম, ‘কী বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চান’? তিনি কোন রাখঢাক না করেই বললেন, ‘স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে’। আমি বললাম, ‘আপনি বরং এ বিষয়ে কোন স্পেশালিস্টের সাথে কথা বলুন’। তিনি মৃদু হেসেই জবাব দিলেন, ‘আমি তো আপনার সাথে কথা বলার জন্য এসেছি’। কিছুটা বিব্রত হলাম। নিজেদের অযোগ্যতার কথা বিনীতভাবে প্রকাশ করেই আলোচনা সূচনা করলাম।

তিনি বক্তব্যের সূচনাতেই বললেন, ‘যা দেখা যায় না বা যা অনুভব করা যায় না তার কোন অস্তিত্ব নেই। তাই আমরা যেহেতু স্রষ্টাকে দেখতে পাই না বা অনুভব করতে পারি না, তাই স্রষ্টা বলে কোন অস্তিত্ব স্বীকার মূর্খতার নামান্তর’। তার কথার সারমর্ম হলো, যা ইন্দ্রিয়গ্রায্য নয় তার কোন অস্তিত্ব নেই। ইসলামে ‘অদৃশ্যের ওপর বিশ্বাস’ তথা ‘ঈমান বিল গায়িব’এর কথা বলা হয়েছে সেকথা তা তিনি মানতে রাজী নন। সবকিছু নিজের চর্মচক্ষু দিয়ে প্রত্যক্ষের পক্ষপাতি। যদিও তার এমন দাবি মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।

তার কথার প্রত্যুত্তরে বললাম, ‘আপনার কথার সাথে আমি পুরোপুরি একমত। তবে এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, সকলেই সব কিছুই দেখেন না আর সব কিছু অনুভব করেন না। সকলের ইন্দ্রিয় সমান্তরালভাবে সংবেদনশীল নয়। তাই মানুষে মানুষে দৃষ্টি ও অনুভূতির বৈপীরিত্য রয়েছে’।

ভদ্রলোক আমার কথার তীব্র বিরোধীতা ও প্রতিবাদ করে বললেন, ‘আপনার কথার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আপনার চোখ যা দেখে আমার চোখও তা দেখতে পারে। আপনার ইন্দ্রিয় যা গ্রাহ্য করে আমার ইন্দ্রিয়তে তা গ্রাহ্য হবে’। আমি বিনীতভাবে উত্তর দিয়ে বললাম, ‘আমার কথা নয় বরং আপনার কথায় পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক’। বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ যুক্তি-পাল্টা যুক্তি চললো। শেষ পর্যন্ত আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘আপনার রক্তের গ্রুপ কী’? অবলীলায় জানালেন, ‘বি-পজিটিভ’। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি নিজের চোখে দেখেছেন’? জবাব আসলো পুরোপুরি নেতিবাচক। বললাম, ‘আপনি কিসের ভিত্তিতে আপনার রক্তের গ্রুপের বিষয়ে নিশ্চিত হলেন? তিনি সাবলীলভাবে জবাব দিয়ে বললেন, ‘প্যাথোলজিস্ট ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেছেন’।

জড়তা অনেকটাই কেটে গেল আমার। বললাম, ‘আপনার শরীরের রক্তের ‘গ্রুপ’ দেখার মত দৃষ্টিশক্তি আপনার নেই। কিন্তু সে দৃষ্টিশক্তি প্যাথোলজিস্টের রয়েছে। তাহলে আপনার ইন্দ্রিয়ানুভূতি আর পেথোলজিষ্টের ইন্দ্রিয়ানুভূতি এক ও অভিন্ন নয়’। তিনি আমার কথার বিরোধীতা করে বললেন, ‘উনি তো সর্বাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে নিয়ে এ কাজ করেছেন’। আমি বললাম, ‘আপনার হাতে যন্ত্র থাকলেই কি সেকাজ করতে পারবেন বা হাতে একতারা থাকলেই বাউল হয়ে যাবেন; আর শাড়ি পড়লেই কি আপনার মধ্যে নারীত্বের প্রকাশ ঘটবে’? ভদ্রলোক থমকে গেলেন কিছুটা!

আমি বললাম, ‘আপনার রক্তের গ্রুপ নির্ধারণের জন্য যেমন এমন বিশেষজ্ঞের দারস্থ হতে হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে হলেও আপনাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের দারস্থ হতে হবে যারা তাদের নিজ কর্ম, অধ্যবসায়, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞানে স্রষ্টাকে দেখেন বা অনুভব করেন। আর আপনি যে একজন প্যাথোলজিস্টের কথায় নিজের রক্তের গ্রুপ সম্পর্ক নিশ্চিত হলেন এটাই তো ‘অদৃশ্যের ওপর বিশ্বাস’ বা ‘ঈমান বিল গায়িব’। এটি কি আপনার স্ববিরোধীতা নয়’?

তিনি মাঝে মাঝেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু যেহেতু অফিসটা আমার। তাই আমি তাকে সে সুযোগ দিইনি। আমার বক্তব্য নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন শুরু হলো। কিন্তু ভদ্রলোক যুক্তি-পাল্টা যুক্তিতে খুব একটা সুবিধা করতে পারলেন না। খানিকটা পর্যুদস্তই হলেন বলা যায়। শেষ পর্যন্ত বললাম, ‘বিশ্বাসের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার শর্ত শুধু অবৈজ্ঞানিকই নয় বরং শিষ্টাচার ও শালীলতা বিবর্জিত উন্মত্ততা’। তিনি আমার কথায় একমত হতে পারলেন না। আমি বিভিন্নভাবে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত বললাম, ‘আপনি যাকে বাবা ডাকেন তার অনুকূলে আপনার কাছে প্রত্যক্ষ করার কী কী তথ্য-উপাত্ত আছে? কিসের ভিত্তিতে একজনকে বাবা সম্বোধন করেন? তিনি নিম্নস্বরেই জবাব দিয়ে বললেন, ‘মা বলেছেন’! ‘আপনি তো শুরুতেই দাবি করেছেন যে নিজের চোখে না দেখলে আপনি কোন কিছুর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবেন না। বিষয়টিকে স্ববিরোধীতা নয় কী’? জবাব দিলাম শক্ত ভাষায়। আমি তাকে একথাও বোঝানার চেষ্টা করলাম যে, কোন মা স্বৈরিণী বা মিথ্যাবাদিনীও হতে পারেন। শেষ পর্যন্ত বললাম, আপনি যাকে ‘মা’ ডাকেন তার কী দলিল-প্রমাণ আপনার কাছে আছে’? ভদ্রলোক একেবারে নিরুত্তর হয়ে গেলেন। শেষে বললেন, ‘এভাবে তো কখনো ভাবিনি’। বললাম, ‘ভাবতে শিখুন। চিন্তার পরিধিকে সংকীর্ণ বৃত্তে আবদ্ধ রাখবেন না’।

সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ধারায় এক সময় মানুষ যুদ্ধ করতো বন্য প্রাণীর বিরুদ্ধে। তারপর শুরু হলো মানুষে মানুষে যুদ্ধ। প্রথমে নিজেদের সাথে। তারপর দেশের গণ্ডি পেড়িয়ে ছড়িয়ে যায় দেশ হতে দেশান্তরে। এ যুদ্ধগুলো ছিল বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব, অহংকার আর মতবিরোধের যুদ্ধ। কে কার ওপর শক্তিমত্তার মাধ্যমে প্রধান্য বিস্তার করতে পারে সে যুদ্ধ। আর তা চলে এসেছে সৃষ্টির আদিকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। কিন্তু সে শক্তিমান মানুষই সৃষ্টির আদিকাল থেকে জিম্মি থেকেছে প্রায় অস্তিত্ব ও অবস্থানহীন ভাইরাস সহ নানাবিধ মহামারির কাছে। প্রধান্য বিস্তার করেছে বিশ্বের সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রের ওপর। নাস্তিক্যবাদী ও বস্তুবাদী দর্শন এবং তথাকথিত বিজ্ঞান মনোষ্করা সৃষ্টিকূলের অসহায়ত্তের বিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারে নি। ভাইরাস বা মহামারি তাদের কাছে দৃশ্যমান হয়নি বরং দেখেছে ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা। ফলে সভ্যতার সংঘাতও এক কেন্দ্রে কেন্দ্রিভূত হয়েছে। বস্তুত, বিশ্ববাসী তো অশরীরি ও অনুভূতিহীন ভাইরাস বা মহামারির কাছেই জিম্মি। কোন সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রই এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না। খেয়ালের বসে এসেছে; আবার ব্যাপক তাণ্ডবলীলার পর অন্তর্ধানও ঘটছে আপন গতিতেই। বিশ্ববাসী শুধুই নীরব দর্শক। অসহায় বস্তুবাদীরাও।

নাস্ত্যিকবাদীরা নিজেদেরকে অত্যন্ত পরাক্রমী বলে দাবি করলেও বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। কারণ, এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাস বা মহামারি সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই সৃষ্টি ও সভ্যতাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এমনকি মহাপ্রলয় বললেও অত্যুক্তি হবার কথা নয়। আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এক্ষেত্রে পুরোপুরি আকার্যকর। বস্তুত, মানবসভ্যতার ইতিহাসে অসংখ্য মহামারি কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং বদলে দিয়েছে মহাবিশ্বের গতিপথ। নিম্নের আলোচনা থেকেই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠবে।

কোভিড-১৯ (COVID-১৯) : ২০১৯ সালের শেষের দিকে শুরু হওয়া এ করোনাভাইরাস মহামারি বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি ইতিহাসের অন্যতম বড় বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে পরিচিত। এ ভাইরাসের তাণ্ডবে সারাবিশ্বে সরকারিভাবে প্রায় ৭১ লাখ (৭.১ মিলিয়ন) থেকে ৭০ লাখ (৭.০ মিলিয়ন) মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে, বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (WHO) এবং অন্যান্য গবেষণা সংস্থার মতে, মহামারির কারণে সৃষ্ট পরোক্ষ ও অপ্রকাশিত মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনা করলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি এবং তা প্রায় ২ কোটি হতে পারে।

স্প্যানিস ফ্লু (১৯১৮): ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এ মহামারিটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে আঘাত হানে। এতে বিশ্বের প্রায় ৫ কোটি মানুষ প্রাণ হারান।

ব্ল্যাক ডেথ (১৩৪৭-১৩৫১): এটি ছিল মধ্যযুগের একটি ভয়ংকর গ্রন্থিপ্রদাহজনিত প্লেগ (bubonic

plague) । ধারণা করা হয়, এর কারণে ইউরোপের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং কয়েক কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।

গুটিবসন্ত (Smallpox) : ১২,০০০ বছরের ইতিহাসে গুটিবসন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৫০ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। ১৭৯৬ সালে এডওয়ার্ড জেনারের আবিষ্কার করা ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে এ রোগটি পৃথিবী থেকে নির্মূল করা সম্ভব হয়।

কলেরা (১৮১৭-১৯২৩): ইতিহাসে কলেরার অন্তত সাতটি বড় বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব বা মহামারি ঘটেছে। এতে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

এইচআইভি/এইডস (HIV/AIDS) : বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে শনাক্ত হওয়া এ রোগটি এখনো বিশ্বের অন্যতম মারাত্মক মহামারি হিসেবে বিবেচিত।

সার্স ও মার্স (SARS & MERS): ২০০২ সালে সার্স এবং ২০১২ সালে মার্স (ক্যামেল থেকে মানবদেহে সংক্রমিত) নামক নতুন করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছিল।

অন্যান্য প্রাচীন মহামারি ইতিহাসে আরও বেশ কিছু মহামারির উল্লেখ পাওয়া যায়। যেগুলো মানবসভ্যতাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০ অব্দের এথেন্সের মহামারি (টাইফয়েড জ্বর), প্লেগ অফ জাস্টিনিয়ান, এবং ১৮৫৫ সালের তৃতীয় প্লেগ মহামারি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এসব মোকাবেলায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

সভ্যতার স্বর্ণযুগেও যখন নাস্তিকবাদ ও আস্তিক্যবাদ প্রশ্নে সমাধান করা সম্ভব হয়নি, সেখানে বৈশ্বিক ভাইরাস ও মহামারিগুলো এক্ষত্রে বড় ধরনের সফলতা পেয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ স্রষ্টার কাছে সৃষ্টির অসহায়ত্ত চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। মূলত এসব প্রাণঘাতি ভাইরাস ও মহামারি মানুষের মধ্যে আস্তিক্যবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছে এবং বিকশিত করেছে। মানবসভ্যতা এ যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে সে মহান সত্ত্বার ও একত্ববাদের দিকেই ফিরে আসতে শুরু করেছে। এতোদিন যারা নাস্তিক্যবাদী চেতনা ধারণ ও লালন করতেন তাদের অনেকের মুখেই এখন স্রষ্টার প্রশস্তি শোনা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গতিবিধিও এখন স্রষ্টামূখী। এমনকি ইটালীর প্রধানমন্ত্রীও নাকি আকাশের মালিকের ওপরই এখন নির্ভর করতে শুরু করেছেন। কথায় আছে, ‘সব কিছুই তার মূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করে’। বৈশ্বিক ভাইরাস ও মহামারিগুলো কি সভ্যতাকে মূলের দিকেই ফেরাতে মানবসভ্যতাকে সহায়তা করেছে? এমন দাবি তো এখন আত্মসচেতন ও বিশ্বাসী মানুষের মুখে মুখে। www.syedmasud.com