॥ নাছির উদ্দিন শোয়েব ॥
‘বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়’ এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বাংলা প্রবাদ। এর মূল অর্থ হলো-বাইরের রূপ, আকার বা নামের চেয়ে তার কাজ বা ফলাফলই আসল। একটি গাছ কেমন তা তার নাম বা পাতা দেখে পুরোপুরি বোঝা যায় না, যখন তাতে সুস্বাদু ফল ধরে তখনই তার আসল পরিচয় ও সার্থকতা প্রমাণিত হয়। এ কথাটি এখানে উল্লেখ করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পোশাক ও তার রঙের পরিবর্তন প্রসঙ্গে।
পোশাকের রং কেমন তার ওপরই নির্ভর করে না ওই বাহিনী আইনশৃঙ্খলা দমনে কেমন পারদর্শী। পোশাক একটি বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও-পোশাকের রংয়ের ভিন্নতায় আইনশৃঙ্খলা দমনে বিঘœ ঘটেছে বিশে^ এমন কোনো নজির আছে কি না জানা নেই। বিশে^র কোথাও কোনো বাহিনী তার নিজ বাহিনীর পোশাকের জন্য সরকারের কাছে তদবির করে ‘গো ধরে’ এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী সম্প্রতি তাদের পোশাকের রং পরিবর্তনের জন্য বর্তমান সরকারের কাছে ব্যাপক তদ্বির করেছে। বাহিনীটির সাবেক সদস্যদের সংগঠন বিবৃতি দিয়েও একই কথা বলেছে। এই বিষয়টি সামনে এসেছে এ কারণে-আমাদের পুলিশের, বা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ইউনিফর্মের (পোশাক) রঙে আবারও পরিবতর্ন করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
এ বিষয়ে সরকার প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে। কেন পোশাক পরিবর্তন করা হচ্ছে? উত্তর হচ্ছে-বাহিনীটির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আবদারের কারণে। জানা গেছে-পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তাদের পোশাক নিয়ে অসন্তোষের কথা জানান। পোশাক পরিবর্তন নিয়ে কথাগুলো হচ্ছে এরকম যেনো তাদেরকে বাঘ থেকে বেড়াল বানো হয়েছে। আর এ কাজটি করেছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সাথে আলোচনা না করেই বা মতের বিপরীতে গিয়ে বাহিনীর পোশাকের রং পরিবর্তন করে নতুন পোশাক দিয়েছে। এই পোশাক পরে আইনশৃঙ্খলা দমন অসম্ভব হয়ে পড়েছে! তারা তাদের আগের পোশাকে ফিরে যেতে চায়। তারা পূর্বের লোগোর (মনোগ্রাম) কথা এখনো কিছু বলেনি- যেখানে ‘নৌকা’ প্রতীক খচিত ছিল। বাংলাদেশ পুলিশের লোগো থেকে বিতর্কিত ও দলীয় প্রতীক হিসেবে পরিচিত পাল তোলা নৌকা বাদ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের অনুমোদনক্রমে চূড়ান্ত হওয়া নতুন লোগোয় নৌকার পরিবর্তে জাতীয় ফুল শাপলা, ধানের শীষ ও গমের ছড়া এবং তিনটি পাটপাতা যুক্ত করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ সংস্কারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। পূর্বে ২০০৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পুলিশের মনোগ্রামে পুনরায় নৌকা প্রতীক যুক্ত করেছিল। তবে পুলিশ বাহিনীর আবদার দেখে মনে হচ্ছে কোনো একসময় পুলিশ বাহিনী এও আবদার জানাতে পারে যে আমাদের পূর্বের সেই নৌকা প্রতীকের লোগোটিই পারফেক্ট ছিল-যা পুলিশ বাহিনীর মর্যাদারও প্রতীক! আমরা নৌকা খচিত প্রতীকসহ পুলিশের পূর্বের মনোগ্রাম চাই!
এই কথাগুলো বলার অর্থ হলো-গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে উন্নতির আশা করেছিল প্রকৃতপক্ষে তা কি হয়েছে? প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে নৃশংসতা। শিশু ধর্ষণ থেকে শুরু করে চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে। সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ার খবর আসছে গণমাধ্যমগুলোতে। রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলী করে হত্যা, অপহরণের পর খুন, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই লুটতারাজে মানুষ আতঙ্কিত।
ব্যবসায়ীরা ভয়ে থাকে কখন চাঁদাবাজরা এসে বুকে অস্ত্র ঠেতিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। প্রকাশ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের চলছে অস্ত্রের মহড়া। মাদক সিন্ডিকেট সক্রিয়। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাতেœ অতিষ্ঠ রাজধানীসহ সারাদেশের মানুষ। আর এসব কারা করছে? কি তাদের পরিচয়? সন্ত্রাসীদের কোনো পরিচয় নেই- সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা এসব কথা বললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কয়জন ধরা পড়ছে। পুলিশের নামকাওয়াস্ত চালানো অভিযানে কারা ধরা পড়ছে? প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। সন্ত্রাসীরা পাড়া মহল্লায় কাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে থাকে অপরাধ করছে সাধারণ মানুষ জানলেও জানা নেই পুলিশ বাহিনীর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-অপরাধ দমনে বা এসব সন্ত্রাসীদের পাকড়াও করতে গেলে পুলিশের বর্তমান পোশাক বাধা হয়ে দাঁড়ায়? অথবা পোশাক পরিবর্তন করলেই কি আইনশৃঙ্খলা দমন সহজ হয়ে যাবে? এধরণের অলীক চিন্তা নিয়ে একটি দেশের পুলিশ বাহিনীর শুধু পোশাক পরির্বতনের জন্য গো ধরে বসে থাকা কতটা সমীচীন?
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এই সংস্কারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ইউনিফর্ম পরিবর্তন বা আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা ও পদক্ষেপ দেখা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ ও কার্যকর করা। পুলিশ বাহিনী দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে সমালোচিত ছিল। তাই ইউনিফর্ম পরিবর্তনকে একটি প্রতীকী সংস্কার (symbolic reform) হিসেবে দেখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল জনগণের কাছে “নতুন পুলিশ” এর বার্তা দেওয়া। পূর্ববর্তী সময়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি অভিযোগ ছিল
ফলে জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। জনআস্থা পুনর্গঠন (Public Trust) ছিল উদ্দেশ্য। ইউনিফর্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয় পুলিশের নতুন ভাবমর্যাদা তৈরি করা। জনগণের সঙ্গে দূরুত্ব কমানো। রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে থাকার বার্তা দেওয়া। পুরোনো ইউনিফর্ম অনেক সময় পূর্ববর্তী সরকারের সময়ের সঙ্গে প্রতীকীভাবে যুক্ত হয়ে যায় তাই নতুন ইউনিফর্ম দিয়ে বোঝানো হয় পুলিশ এখন রাজনৈতিক নয়, পেশাদার বাহিনী। আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নয়ন। আন্তর্জাতিক মান (UN, পশ্চিমা দেশ) অনুসরণ করে ইউনিফর্ম আধুনিক করা। হালকা কাপড়, উন্নত ডিজাইন, প্রযুক্তি বহনের সুবিধা এবংট্যাকটিক্যাল গিয়ার ব্যবহারের উপযোগী করা। শুধু ইউনিফর্ম পরিবর্তন করলেই বাস্তব পরিবর্তন আসে না, আচরণ, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা থাকা জরুরি।
বাংলাদেশে পুলিশের ইউনিফর্মের শুরু মূলত ব্রিটিশ শাসনামল থেকে। তখন খাকি (khaki) রঙের পোশাক চালু হয়। উদ্দেশ্য ছিল: ধুলাবালি ও মাঠে কাজের সময় কম চোখে পড়া। একসময় পাগড়ি বা ক্যাপ ব্যবহৃত হতো। এই খাকি রঙ এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের পুলিশের ঐতিহ্য। পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) খাকি ইউনিফর্মই বহাল থাকে। ডিজাইনে কিছু পরিবর্তন আসে (শার্ট, প্যান্ট, ব্যাজ)। সামরিক ধাঁচ (military style) প্রভাব বেশি ছিল। স্বাধীনতার পরও (১৯৭১-২০০০) খাকি ইউনিফর্ম রাখা হয়। ধীরে ধীরে “বাংলাদেশ পুলিশ” এর নিজস্ব ব্যাজ, মনোগ্রাম যুক্ত হয়। তবে বড় কোনো ডিজাইন পরিবর্তন হয়নি। ইউনিফর্ম ছিল তুলনামূলক ভারী ও কম আরামদায়ক। আধুনিক পরিবর্তন (২০০০-এর পর)। বড় পরিবর্তন আসে: খাকি থেকে গাঢ় নীল (navy blue) ইউনিফর্ম।
এই পরিবর্তনের কারণ উল্লেখ করা হয়- আধুনিক ও পেশাদার লুক, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য, সহজে পরিচিতি ও আলাদা করা, কাপড় হালকা ও আরামদায়ক করা হয়। পকেট, বেল্ট, সরঞ্জাম বহনের সুবিধা বাড়ানো হয়। এরপর আধুনিক প্রযুক্তি ও সুবিধা যুক্ত হয় পুলিশের ইউনিফর্মে। বডি ক্যামেরা, ওয়্যারলেস সেট, আধুনিক বেল্ট যুক্ত হয়েছে। দ্রুত মোতায়েন (rapid response) সুবিধার জন্য ইউনিফর্ম ডিজাইন আপডেট নিরাপত্তা সরঞ্জাম (ভেস্ট, হেলমেট) যুক্ত করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের নতুন ‘আয়রন গ্রে’ রঙের পোশাক চালু করার পেছনে ৭৬ কোটি টাকা (৭৬০ মিলিয়ন) খরচ হয়েছিল। পরবর্তীতে পুলিশ সদস্যদের অসন্তুষ্টি ও নানা পর্যালোচনার পর, পুলিশের ইউনিফর্মে পুনরায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সকল পুলিশ ইউনিটের প্যান্ট খাকি রঙের এবং শার্টের ক্ষেত্রে জেলা পুলিশে গাঢ় নীল ও মেট্রোপলিটন পুলিশে হালকা জলপাই (লাইট অলিভ) রঙ নির্ধারণ করা হয়েছে। আবার কয়েক কোটি টাকা খরচ করে পোশাক পরিবর্তন করার পর আইনশৃঙ্খলা দমন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় কতটা ভূমিকা রাখবে তা দেখার অপেক্ষায়। লেখক : সাংবাদিক।