নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাসে নিষেধাজ্ঞা থাকা ২৫০টি পণ্যভর্তি কনটেইনারের কোনো হদিস মিলছে না। চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব কনটেইনারের ডেলিভারি আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এমনকি কাস্টমসের স্বয়ংক্রিয় এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড (অঝণঈটউঅ ডড়ৎষফ) সিস্টেমেও সেগুলোর ডেলিভারি স্ট্যাটাস ‘লক’ করা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কনটেইনারগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি ঘিরে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কাস্টমসের তদারকি এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের ধারণা, একটি শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট জাল কাগজপত্র ও ডিজিটাল কারসাজির মাধ্যমে কনটেইনারগুলো বন্দর থেকে বের করে নিতে সক্ষম হয়েছে। এ ঘটনায় গত সাত মাসে পাঁচ দফা চিঠি দিয়ে কনটেইনারগুলোর অবস্থান জানতে চাইলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি বলে অভিযোগ করেছে কাস্টম হাউস।

কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পাঁচ শতাধিক আমদানি কনটেইনারের খালাস স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে কিছু কনটেইনার পরে বৈধভাবে খালাস হয়েছে, কিছু নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। তবে ২৫০টি কনটেইনারের ক্ষেত্রে কোনো আমদানিকারক বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেননি এবং পণ্য খালাসেরও কোনো উদ্যোগ নেননি। ফলে বছরের পর বছর কাগজে-কলমে কনটেইনারগুলো বন্দরে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি সামনে আসে ২০২৫ সালে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা দুই কনটেইনার কাপড় নিলামে বিক্রি করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। নিলামে জয়ী প্রতিষ্ঠান শাহ আমানত ট্রেডিং নির্ধারিত অর্থ পরিশোধের পর বন্দরের ইয়ার্ডে গিয়ে কনটেইনার দুটি খুঁজে পায়নি। এরপরই কাস্টমস কাগজে থাকা অন্যান্য লক করা কনটেইনারের অবস্থান যাচাই শুরু করে। তদন্তে দেখা যায়, এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক থাকা ২৫০টি কনটেইনারের কোনো হদিস নেই।

নিখোঁজ কনটেইনারগুলোর মধ্যে ২০২১ সালের ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি কনটেইনার রয়েছে। কাস্টমসের ধারণা, দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এগুলো সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ঘোষণা-বহির্ভূত বা চোরাই পণ্য থাকার তথ্য পাওয়ার পর জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলোর খালাস বন্ধ করা হয়। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল অব এন্ট্রি জমা না পড়ায় কায়িক পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বন্দরে কনটেইনারগুলো পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, বন্দরে কনটেইনার সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের। তাই একাধিকবার চিঠি দিয়ে কনটেইনারগুলোর অবস্থান জানতে চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

তারেক মাহমুদ আরও বলেন, বন্দরে ৩৫ হাজারের বেশি কনটেইনার থাকে। নিখোঁজ কনটেইনারগুলো এখনও ভেতরে আছে, নাকি বের হয়ে গেছে-এ তথ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের। কিন্তু তারা কোনো ব্যাখ্যা না দেওয়ায় কনটেইনারগুলো হারিয়ে গেছে বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে শুধু রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। তাদের মতে, এসব কনটেইনারে কী ধরনের পণ্য ছিল, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। কারণ অতীতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র, মাদক ও নিষিদ্ধ পণ্যের চালান এসেছে।

২০০৪ সালের ২ এপ্রিল কর্ণফুলী নদীর সিইউএফএল জেটিতে খালাসের সময় ১০ ট্রাকভর্তি প্রায় পাঁচ হাজার অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, ২৭ হাজার গ্রেনেড, বিপুল পরিমাণ গুলি ও রকেট লঞ্চার উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ২০১৫ সালে সূর্যমুখী তেলের ঘোষণা দিয়ে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা মূল্যের তরল কোকেন, ২০২১ সালে সরিষা বীজের ঘোষণা দিয়ে ৪২ টন পপি সিড এবং ২০২২ সালে পাঁচ কনটেইনার বিদেশি মদ ও সিগারেটের চালান জব্দ করে কাস্টমস।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর এমদাদ বলেন, এসব কনটেইনারে শুধু উচ্চ শুল্কের পণ্য ছিল-এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। অতীতে অস্ত্র, মাদক এমনকি বিপজ্জনক পদার্থও এই বন্দর দিয়ে এসেছে। তাই নিখোঁজ কনটেইনারগুলোর প্রকৃত অবস্থান ও ভেতরে থাকা পণ্যের তথ্য দ্রুত উদ্ঘাটন করা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই জরুরি। তার মতে, কাস্টমসের একাধিক চিঠির জবাব না দেওয়া বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলারই প্রমাণ।

এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান বলেন, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট জাল কাগজপত্র ও ডিজিটাল কারসাজির মাধ্যমে পণ্য খালাসের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম বলেন, একটি কনটেইনার কাস্টমসের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া বন্দর থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। অতীতে জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে কনটেইনার খালাসের বহু ঘটনা ঘটেছে। তাই ২৫০টি কনটেইনারের হদিস না পাওয়া শুধু বন্দরের নিরাপত্তা নয়, কাস্টমসের তদারকি ব্যবস্থারও বড় ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। তার মতে, এই ঘটনায় বন্দর ও কাস্টমস-উভয় পক্ষের দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।