তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ গ্রাম কমিটি ডাকে গতকাল শনিবার রংপুর লালমনিরহাট ও নীলফামারীর তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন এলাকায় একযোগে দীর্ঘ মানবন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মানববন্ধনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গণ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার কয়েকহাজার মানুষ অংশ গ্রহণ করেন।

রংপুর অফিস ঃ “তিস্তা বাঁচলে উত্তরবঙ্গ বাঁচবে,দেশ হবে সমৃদ্ধ” এই শ্লোগানকে সামনে রেখে তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল শনিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত রংপুর মহানগরসহ উত্তরের জেলা ও উপজেলার ১৪ পয়েন্টে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির আহবানে দীর্ঘ মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

মানববন্ধনে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ননিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসে ক্ষুব্ধ তিস্তা পাড়ের কোটি মানুষ এবার সরাসরি কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে। চলতি বাজেটের সংশোধিত বরাদ্দে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু না হলে রংপুর বিভাগ থেকে রাজধানী ঢাকায় খাদ্য শস্য সরবরাহ বন্ধ এবং প্রয়োজনে ‘ঢাকা ঘেরাও ’কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনের নেতারা।

রংপুর মহানগরীর কাচারী বাজার এলাকায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিম সরকার বলেন, “তিস্তা পাড়ের মানুষের দুর্ভোগের কথা সবাই জানে। বছরের পর বছর ধরে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এখন আর আশ্বাসনয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু দেখতে চায় মানুষ। সরকারের সংশোধিত বাজেটেই এ প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, তিস্তা অববাহিকার কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, নদী ভাঙন ও পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে মহাপরিকল্পনাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ অঞ্চলের মানুষের ন্যায্য দাবিকে আর উপেক্ষা করা যাবে না। মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার আরিফুর রহমান আরিফ। বক্তব্য রাখেন কমিটির উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয কর্মপরিষদ সদস্য এবং রংপুর মহানগর জামায়াতের আমীর এটিএম আযম খান, বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিল রংপুর ইউনিটের সেক্রেটারি এ্যাডভোকেট কাওছার আলী, এনসিপি রংপুর জেলা আহবায়ক আল মামুন, মোহাম্মদ হোসেন, কাকসুর সাবেক জিএস অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, এ্যাডভোকেট তারেকুজ্জামান তারেক, এবং আব্দুল মান্নান তালিব।

এ সময় বক্তারা বলেন, তিস্তা নদীকে ঘিরে পরিকল্পিত উন্নয়ন ছাড়া উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, নদী ভাঙন প্রতিরোধ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। তাই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে অবিলম্বে প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে।

এদিকে একই সময়ে রংপুর মহানগরীর জিলা স্কুল মোড় থেকে শাপলা চত্বর পর্যন্ত দশটি পয়েন্টে ডিসি মোড়, কাচারীবাজার, পুলিশলাইন্স মোড়, সিটিবাজার, পায়রাচত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড়, প্রেসক্লাব চত্বর, ওয়ালটন মোড় ও শাপলা চত্বরে মানববন্ধনে শত শত মানুষ অংশ নেন।

রংপুর প্রেসক্লাব পয়েন্টে গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাজেদুর রহমান মাজেদ। শিক্ষাবিদ আবু বক্কর সিদ্দিক, ডাক্তার আজহার আলী শাহ ও ডক্টর আজিজুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন। রংপুরসহ, শনিবার একযোগে তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন এলাকায় একই দাবিতে মানব বন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। গঙ্গাচড়ার বুড়িরহাট থেকে মহিপুর তিস্তাসড়ক সেতু পর্যন্ত কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য অধ্যাপক রায়হান সিরাজী। অপর দিকে কাউনিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে তিস্তা সেতু পর্যন্ত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন রংপুর -৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলামর রব্বানী এবং রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা নুরুল আমিন।

মানববন্ধনে তারা বলেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও ত্রাণমন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করলেও বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায় নি। ফলে তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। আগামীদিন গুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না এলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে উত্তরাঞ্চলের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে ধারাবাহিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়।

নীলফামারী ও ডিমলা সংবাদদাতা : তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে নীলফামারীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শনিবার (২০ জুন) সকালে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির আয়োজনে এই মানববন্ধন অনুষ্টিত হয়। তিস্তা ব্যারেজের সামনে থেকে শুরু হয়ে ডালিয়া-পাগলাপীর সড়কের প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই মানববন্ধন অনুষ্টিত হয়।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সদস্য প্রভাষক ছাদের হোসেনের সঞ্চালনায় মাবববন্ধনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট আলফারুক আব্দুল লতীফ, নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সালাফি ও নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মোহাম্মদ আব্দুল মুনতাকিম। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সংগ্রাম কমিটির সদস্য মাওলানা আন্তাজুল ইসলাম,অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম,মুজিবুর রহমান, মোখলেছার রহমান,মনিরুজ্জামান জুয়েল, আব্দুল কাদিম,এ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ পাটোয়ারী,সাংবাদিক কামারুজ্জামান প্রমূখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার বলেন বৃহস্পতিবার মন্ত্রী পরিষদের দুইজন সদস্য তিস্তা ব্যারেজ এলাকা পরিদর্শন করেন। কিন্ত অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এর কয়েক ঘন্টা পর তিস্তায় পানি প্রবাহ বেড়ে যায়। এই বিষয়ে অবশ্যই সংসদে কথা উঠাতে হবে। কি কারণে উজানে ভারী বর্ষন ছাড়াই তিস্তায় পানি প্রবাহ বাড়ল। এ জন্য আন্তর্জাতিক আইনে অবশ্যই মামলা করতে হবে। তা না হলে ভারতকে থামানো যাবে না। ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ,বন্ধু নয়।

তিনি আরো বলেন তিস্তা নদী কয়েকেটি জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে প্রায় ২ কোটি লোক উপকৃত হবে। নদী শাসন হবে,নদী সুশৃঙ্খল হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে রংপুর-বগুড়া অঞ্চলের জনপদ উপকৃত হবে। সুতরাং দেশের সার্থে,জাতীর স্বার্থে সর্বপরি বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। মানববন্ধনে নীলফামারী জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেয়।

লালমনিরহাট সংবাদদাতা : সরকারের নতুন উদ্যোগকে প্রহসন উল্লেখ করে বাজেটে বরাদ্ধের দাবি। দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ ভোটমারীর নদীপাড়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গতকাল শনিবার দুপুরে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির’ ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে রংপুর বিভাগের ৫ জেলার হাজারো মানুষ অংশ নেন বলে আয়োজকরা দাবি করেন। সেখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীর পাশাপাশি কুড়িগ্রাম থেকে নির্বাচিত দলটির ২জন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী ও অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি লালমনিরহাট জেলা শাখার আহবায়ক এ্যাডভোকেট মোঃ ফিরোজ হায়দার লাভলুর নেতৃত্বে মানববন্ধনে ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ হাজার হাজার মানুষ অংশ গ্রহণ করেছে। মানববন্ধনে সংগঠনের সদস্য সচিব মাওলানা মোঃ হাবিবুর রহমান, এ্যাডভোকেট আব্দুল বাতেন, ব্যবসায়ী নেতা মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম রাজু, হাফেজ শাহ আলম ও নিয়াজ আহমেদ রেজা প্রমূখ। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর লালমনিরহাট জেলা শাখার আমীর এ্যাডভোকেট আবু তাহের।

মানববন্ধনে যোগ দেয়া নদীপাড়ের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ নতুন প্রতিশ্রুতির বদলে দ্রুত কাজ শুরুর তাগাদা দেন।

অন্যদিকে সরকারের সম্প্রতি গঠন করা কারিগরি কমিটি এবং গত শুক্রবার সরকারের ৩ মন্ত্রীসহ উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নদী পরিদর্শনকে প্রহসন উল্লেখ, করে পাশ হওয়া বাজেটে তিস্তার জন্য বরাদ্ধের দাবি জানিয়েছেন কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী।