বর্ষণ ও উজানের ঢলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা নদীসহ মাথাভাঙ্গা ও হিসনা নদীর পানি ক্রমাগত বাড়ছে। পাশাপাশি গড়াই নদীতেও পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে নদীসংলগ্ন অন্তত চারটি স্থানে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ভূরকা-হাটখোলা, কোলদিয়াড়, মাজদিয়াড় ও ফয়জুল্লাহপুরসহ প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় শত শত বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও শত শত বিঘা জমি নিয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন স্থানীয়রা। এ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এলাকার হাজারো মানুষ।

স্থানীয় কৃষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গত ১৫-২০ দিনের মধ্যে পদ্মার ভাঙনে কোলদিয়াড় থেকে পাশের ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ পর্যন্ত এলাকায় শতাধিক একরেরও বেশি আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। চলতি মৌসুমে বিস্তীর্ণ মাঠের পাট, আম-কাঁঠালের বাগানসহ নানা মৌসুমি ফসলি জমি হারিয়েছেন কয়েকশ কৃষক।

এক সময় যাদের ছিল সুখের সংসার, ক্ষেতভরা ফসল আর গোলাভরা ধান— সর্বনাশা পদ্মার থাবায় তারা আজ সর্বস্বান্ত। তাদের চোখে-মুখে এখন শুধু বিষাদের ছায়া ও অনিশ্চয়তার ছাপ। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, ফসলি জমির মতো তাদের ভিটেমাটিও কি চলে যাবে নদীর পেটে?

কোলদিয়াড় গ্রামের রফিকুল ইসলাম তাঁর দুর্দশার কথা জানিয়ে বলেন, "আমাদের মোট ৭ বিঘা জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। কেবল গত দুই সপ্তাহের তাণ্ডবেই হারিয়েছি প্রায় এক বিঘা জমি।" বসতবাড়িটি ছাড়া এখন আর তাঁর কিছুই নেই, সেই বাড়িটিও এখন ভাঙনের তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।

নদীভাঙনে ২০ বিঘারও বেশি জমি হারানো ভূরকাপাড়া গ্রামের মহাবুল ইসলাম বলেন, "এখন আমার শুধু মাথা গোঁজার শেষ সম্বল বসতবাড়িটিই অবশিষ্ট আছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে খুব শিগগির সেটিও হারিয়ে পথের ফকির হতে হবে।"

নদীতীরে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মর্জিনা খাতুন বলেন, "অনেক কষ্ট করে এই মাঠে ১৪ বিঘা জমি করেছিলাম। পদ্মার গ্রাসে আজ সব শেষ হয়ে গেল! আমার ঘরে কর্মক্ষম স্বামী ও তিন সন্তানসহ মোট পাঁচজনের সংসার। তীব্র অভাবে কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে।" সরকারের কাছে তাঁদের একটাই আকুতি— অন্তত বসতবাড়িটুকু যেন রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

একইভাবে নদীতীরে এসে অসহায়ত্বের আকুতি জানাচ্ছিলেন বিউটি খাতুন, শুকরুন্নেসা, তবারক হোসেন ও আব্দুল রশিদসহ অনেকে। এদের কারও ভেঙেছে ২৫ বিঘা, কেউ হারিয়েছেন ১০ বিঘা, আবার কারও গেছে ৪-৫ বিঘা জমি।

ভূরকাপাড়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আতর আলী বলেন, প্রতিদিন চোখের সামনেই নদীতে বিলীন হচ্ছে জমি। শত শত কৃষক আজ পথে বসেছেন। তাই তারা সাময়িক সহযোগিতা নয়, নদীভাঙন থেকে এলাকা রক্ষায় জিও ব্যাগ কিংবা সিমেন্টের স্থায়ী ব্লকের বাঁধ চান।

একই এলাকার জাকির হোসেন বলেন, ভূরকাপাড়ার সামান্য একটি অংশে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলায় সেখানে ভাঙন কিছুটা কম। কিন্তু কোলদিয়াড় ও হাটখোলাপাড়া হয়ে রায়টা পর্যন্ত বিশাল এলাকা সম্পূর্ণ অরক্ষিত। ফলে প্রতিদিন জমি ভেঙে নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে।

পদ্মার তীব্র ভাঙনে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক অবকাঠামো ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে। নদীভাঙন সীমানার মাত্র ৫০০ ফুট দূরে রয়েছে ভারত থেকে আসা ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। যেকোনো সময় সঞ্চালন টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া নদীর ঢেউ সরাসরি আঘাত হানছে ঐতিহ্যবাহী রায়টা-মহিষকুণ্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর।

ঝুঁকির মুখে রয়েছে নদী ভরাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভূরকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় কান্দিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও জুনিয়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। একই সঙ্গে হাটখোলাপাড়া জামে মসজিদ, জুনিয়াদহ বাজার এবং ভূরকা, কোলদিয়াড়, জুনিয়াদহ ও কোলদিয়াড় পূর্বপাড়াসহ বেশ কয়েকটি পুরো গ্রামের বাসিন্দারা সব হারানোর ঝুঁকিতে আছেন।

এলাকাবাসী জানান, পদ্মা নদী এখন আর শুধু ফসলের মাঠে সীমাবদ্ধ নেই, ভাঙন সরাসরি বাঁধের কাছাকাছি চলে এসেছে। এখনই জরুরি পদক্ষেপ না নিলে বিস্তীর্ণ গ্রাম ও শত শত ঘরবাড়ি রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

কুষ্টিয়া পাউবোর (পানি উন্নয়ন বোর্ড) নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর ইসলাম বলেন, "পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্প্রতি ভাঙনকবলিত অঞ্চল পরিদর্শন করেছেন। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি আপৎকালীন কাজ ও ভবিষ্যতে নদীর গতিপথ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে প্রাক্কলন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন ও বাজেট পাওয়া মাত্রই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, "দৌলতপুর অঞ্চলে পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তাবনা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কয়েক দফায় কথা হয়েছে, তিনি আশ্বস্তও করেছেন। বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে আড়াই-তিন কোটি টাকার বাজেট চাওয়া হয়েছে। টেকসই নদী শাসনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দাবি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরা হচ্ছে।"

অন্যদিকে কুষ্টিয়া শহরের কোল ঘেঁষে প্রবাহিত গড়াই নদীতেও আশঙ্কাজনকভাবে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ভাঙন দেখা দিয়েছে গড়াই ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে। দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তাই অতি দ্রুত স্থায়ী টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন এলাকাবাসী।