টানটান উত্তেজনা আর রোমাঞ্চে ঠাসা এক মহাকাব্যিক ফাইনাল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেও ভাঙা যায়নি ডেডলক। অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের মাত্র ২৭ সেকেন্ডে (১০৬ মিনিটে) পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামসের সহায়তায় আর্জেন্টিনার জাল কাঁপান বদলি নামা ফেরান তোরেস। আর এই একমাত্র গোলেই আর্জেন্টিনাকে বোতলবন্দি করে নিউইয়র্ক স্টেডিয়ামে নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরল স্পেন। ২০১০ সালের পর এটিই তাদের প্রথম বিশ্বজয়। আর ২০১৪ সালের পর আবারও কোনো বদলি খেলোয়াড়ের (মারিও গোৎসে) গোলেই স্বপ্নভঙ্গ হলো আর্জেন্টিনার।
প্রথমার্ধেই স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মেলে। ম্যাচের মাত্র ৫ মিনিটেই গোলের সুবর্ণ সুযোগ পায় ‘লা রোজা’রা। লামিনে ইয়ামাল বক্সে ক্রস বাড়ালে বলটি ডিফ্লেক্ট হয়ে দানি ওলমোর কাছে যায়। ওলমো দারুণভাবে বলটি আবার ইয়ামালের দিকে বাড়িয়ে দিলেও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় গোল থেকে বঞ্চিত হয় স্পেন। ম্যাচের ৭ মিনিটে উল্টো ভীতি ছড়ায় আর্জেন্টিনা; তবে উনাই সিমন নিজের লাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে এসে লিওনেল মেসিকে নিশ্চিত গোলের সুযোগ থেকে দুর্দান্তভাবে রুখে দেন।
খেলার প্রথম ২৩ মিনিটে মাত্র ৩২ শতাংশ বল দখলে রাখতে পেরেছিল আর্জেন্টিনা। স্প্যানিশদের কড়া মার্কিংয়ের কারণে তাদের তিন ফরোয়ার্ড লিওনেল মেসি, নিকো গঞ্জালেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ মিলে মাত্র ১৭ বার বলে পা ছোঁয়াতে পেরেছিলেন। স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি পুরো মাঠ জুড়ে খেলে ডিফেন্সে তৃতীয় সেন্টার ব্যাকের ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার অর্ধে তীব্র চাপ তৈরি করেন। ৩৯ মিনিটে লাপোর্তে, রদ্রি ও বাায়েনার দারুণ বোঝাপড়া থেকে বল পেয়ে বক্সের প্রান্ত থেকে জোরালো শট নেন মিকেল ওয়ারজাবাল, তবে মার্টিনেজ নিচে নেমে তা রুখে দেন।
৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে ফাইনালের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এবং এর দুই মিনিট পরেই ইনজুরি নিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। তার বদলে মাঠে নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি। বিরতির ঠিক আগে মার্ক কুকুরেয়ার একটি দারুণ প্রচেষ্টা পোস্টের পাশ দিয়ে বাইরে চলে যায়। প্রথমার্ধ শেষে স্পেনের বল পজেশন ছিল ৬৫ শতাংশ এবং পাসের সংখ্যা ছিল ৩১৩টি, যেখানে আর্জেন্টিনার পাস ছিল মাত্র ১৫৫টি। পুরো প্রথমার্ধে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা গোলের উদ্দেশ্যে একটি শটও নিতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে পারেদেসের দুঃস্বপ্ন ও ওতামেন্দির প্রতিরোধ
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই নিকো গঞ্জালেজকে উঠিয়ে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে মাঠে নামান আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। তবে মাঠে নামার পর থেকেই পারেদেসের জন্য ম্যাচটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ৪৭ মিনিটে ওয়ারজাবালের পাস থেকে আলেক্স বাায়েনা শট নিলেও তা সহজেই লুফে নেন মার্টিনেজ। এর কিছুক্ষণ পর পারেদেস অযথাই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে তাকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়, যা নিয়ে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়।
৫৫ মিনিটে স্পেন পাল্টা আক্রমণে উঠলে ওতামেন্দির শেষ মুহূর্তের দারুণ ট্যাকলে রক্ষা পায় আর্জেন্টিনা। পরের মিনিটে ওলমোর ব্যাকপাস থেকে কুকুরেয়া শট নেওয়ার আগেই বল ক্লিয়ার করেন গঞ্জালো মন্তিয়েল। এর দুই মিনিট পর মন্তিয়েলের বদলে নাহুয়েল মলিনাকে মাঠে নামানো হয়। ৬২ মিনিটে স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে জোড়া পরিবর্তন এনে ফাবিয়ান রুইজের জায়গায় পেদ্রি এবং ওয়ারজাবালের পরিবর্তে ফেরান তোরেসকে নামান। ৬৪ মিনিটে ওলমোর দূরপাল্লার শট রুখে দেন মার্টিনেজ। এরপর ইয়ামালের নিখুঁত ক্রস থেকে তোরেস নিচু হেড করলেও তা মার্টিনেজের হাতে জমা পড়ে।
১৯৬৬ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রথম দল হিসেবে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম ৭০ মিনিটে লক্ষ্যে কোনো শট রাখতে পারেনি। ৭০ মিনিটে ডে পলকে তুলে জিউলিয়ানো সিমিওনে এবং ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে ফাকুন্দো মেদিনাকে মাঠে নামায় আর্জেন্টিনা। ৭৫ মিনিটে স্পেনেও আসে জোড়া পরিবর্তন; ওলমোর জায়গায় মিকেল মেরিনো ও বাায়েনার জায়গায় নামেন নিকো উইলিয়ামস। ৭৭ মিনিটে পেদ্রির শট লক্ষ্যভ্রষ্ট করার পর কুবার্সির শটও মার্টিনেজের গায়ে লেগে বাইরে যায়। ৮০ মিনিটে উইলিয়ামসের ক্রসে লাপোর্তের হেড এবং ৮৭ মিনিটে তোরেসের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য সমতায় শেষ হয়।
লাল কার্ডের নাটক ও তোরেসের শিরোপাজয়ী গোল
ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে উইলিয়ামসের একটি শক্তিশালী শট রুখে দেন আলবিসেলেস্তে কিপার মার্টিনেজ। এর কিছুক্ষণ পরই পাও কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ। শেষ মুহূর্তে পারেদেস ইয়ামালকে ফাউল করলে বক্সের সামনে থেকে নেওয়া ফ্রি কিক দারুণভাবে ঠেকিয়ে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান মার্টিনেজ।
অতিরিক্ত সময়ের ৯৬ মিনিটে নাটকীয়ভাবে স্পেনের একটি গোল বাতিল হয়। ইয়ামালের প্রচেষ্টায় মেরিনো শট নিলে মার্টিনেজ তা ব্লক করেন, আর আলগা বল পেয়ে জালে জড়ান নিকো উইলিয়ামস। তবে ভিএআর (VAR) পরীক্ষার পর ওতামেন্দির ওপর মেরিনোর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করেন রেফারি স্লাভকো ভিনসিক।
তবে স্পেনের জয়োৎসব বেশিক্ষণ আটকে রাখা যায়নি। ১০৬ মিনিটে পেদ্রো পোরোর দূরপাল্লার ক্রসে নিকো উইলিয়ামসের ফ্লিক থেকে বল পেয়ে চমৎকার ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনার জাল কাঁপান ফেরান তোরেস। ১০ জনের আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করলেও স্পেনের এই রক্ষণব্যূহ ও কৌশলগত আধিপত্যের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয়। আর এর মাধ্যমেই বিশ্বফুটবলের নতুন রাজা হিসেবে মুকুট পরল স্পেন।