জাতিসঙ্ঘের অভিবাসন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে বিশ্বে অষ্টম স্থাানে ছিল। ২০২৪ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ২১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণ করেছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে দশম স্থানে ছিল। ২০১৫ এবং ২০২০ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যথাক্রমে নবম ও সপ্তম। ২০১৫ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে ভারত রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে রয়েছে। ২০২৪ সালে ভারত মোট ১৩৭ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্জন করে রেমিট্যান্স আহরণ বাবদ। ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে মেক্সিকো দ্বিতীয় স্থানে ছিল। তারা মোট ৬৭ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্জন করে এই খাতে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক একক অর্থ বছর হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করে। মাঝখানে কয়েক বছর রেমিট্যান্স আহরণের পরিমাণ কমে গিয়েছিল মূলত হুন্ডি ব্যবসায়িদের তৎপরতার কারণে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হয়। এর আগে স্থানীয় বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার নির্ধারিত ছিল ১১০ টাকা। কিন্তু কার্ব মার্কেটে প্রতি মার্কিন ডলার বিক্রি হতো ১২২ থেকে ১২৩ টাকায়। কার্ব মার্কেটে উচ্চ বিনিময় হার পাবার প্রত্যাশায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণ করতেন। ফলে রেমিট্যান্স দেশে এলেও তা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ যুক্ত হতো না। পরবর্তীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজার ভিত্তিক করার ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণ করতে থাকে।
অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য উপস্থাপনকালে বলেছেন, সরকার রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা হবে। রেমিট্যান্স আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের এই উদ্যোগ কল্পনাপ্রসূত নয়। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে বাংলাদেশ আগামী ৫ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় ব্যাপকভাবে বাড়াতে পারে। তবে এ জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রম মূলত মধ্যপ্রচ্যের ৬টি মুসলিম দেশ কেন্দ্রিক। বিশ্বের অন্যান্য দেশে জনশক্তি রপ্তানি করা হলেও তার পরিমাণ খুবই সামান্য। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বর্ধিত মাত্রায় জনশক্তি রপ্তানি করা হলে এ খাতের আয় অনেকগুন বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে আমরা প্রধানত অদক্ষ এবং অপ্রশিক্ষিত শ্রম শক্তি বিদেশে রপ্তানি করে থাকি। ২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে যে জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি করা হয় তার মধ্যে স্বল্পদক্ষ(আসলে অদক্ষ) শ্রমিকের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আধাদক্ষ শ্রমিকের হার ছিল ৩ দশমিক ৭৭ শতাশ। দক্ষ শ্রমিকের হার ছিল ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। পেশাজীবী (ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি) হার ছিল শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোকে এ চিত্রের খুব একটা পরিবর্তন ঘটে নি। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থান করছে। এদের অর্ধেকও যদি পেশাজীবী এবং প্রকৃতঅর্থে দক্ষ জনশক্তি হতো তাহলে এ খাতের আয় দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা কোন ব্যাপার ছিল না। আগামীতে আমরা যদি নতুন নতুন গন্তব্যে জনশক্তি রপ্তানি করতে পারি এবং পেশাজীবী ও দক্ষ শ্রমশক্তি বিদেশে প্রেরণ করা তাহলে এ খাতের আয় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা কোন ব্যাপার নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাক সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে। কিন্তু এই খাতে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে পুনরায় বিদেশে চলে যায়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে জনশক্তি রপ্তানি খাতে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় তার প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। এছাড়া এখাতে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
জনশক্তি খাতে অর্জিত আয় বৈধ চ্যানেলে দেশে আনার জন্য প্রবাসে বাংলাদেশের সিডিউল ব্যাংকের শাখা সংখ্যা বাড়াতে হবে। ব্যাংকগুলো তাদের প্রতিনিধির প্রবাসী কর্মীদের আবাসস্থলে গিয়ে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে দেশে প্রেরণ করবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাংকে গিয়ে রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণ করতে হলে তাদের কর্মসংস্থল থেকে সাময়িক ছুটি নিতে হয়। আর হুন্ডি ব্যবসায়িরা তাদের আবাসস্থলে গিয়ে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে থাকেন। জনশক্তি রপ্তানি খাতকে দুর্নীতি এবং বিশৃঙ্খলমুক্ত করতে হবে।