॥ মনসুর আহমদ ॥
মহাকালের স্রোতে বর্ষ পঞ্জিকার প্রতিটি দিবসে পৃথিবীতে বিভিন্ন ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এমন একটি দিনও খুঁজে পাওয়া ভার যে দিন ধরণী পৃষ্ঠে কোন ঘটনা ঘটেনি। প্রতিটি দিবসই তার মাঝে ধারণ করে আছে অসংখ্য জানা অজানা কাহিনী, হাসি কান্না, প্রেম, বিরহ মিলনের স্মৃতি। কালের স্রোতে ‘আশুরা’ মহরম মাসের ১০ম দিবসটি ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের জন্য বয়ে নিয়ে আসে বিজয়ের আনন্দ, আর মুসলমানদের ঘরে ঘরে বেজে ওঠে বিরহের করুণ সাহানা সুর।
যতদূর জানা যায় এই বিশেষ দিনটিতে হজরত নূহ (আ:) মহা প্লাবনের পর কিস্তি থেকে ভূমিতে অবতরণ করেছিলেন। হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়Ñএই আশুরার দিনে হজরত মুসা (আ:) ফিরআউনের বন্দী দশা থেকে ইসরাইল সন্তানদেরকে উদ্ধার করেছিলেন এবং ফিরআউনকে আল্লাহ নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনার্থে এই দিনে মুসা (আ:) সিয়াম পালন করেছিলেন। সে কারণে ইয়াহুদীরা আজও আশুরায় রোজা পালন করে থাকে।
বাতেলের বিরুদ্ধে হক প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুসা (আ:)-এর সাফল্য শুধু এক বিজয়ই ছিল না, বরং তা ছিল শাশ্বত ইসলামের বিজয়। যে কারণে রসূল (স:) শাশ্বত বিজয়ের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনার্থে এ দিবসটিকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেন। তিনি এ দিনে রোজা পালনের মধ্য দিয়ে তাঁর অনুসারীদেরকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের জন্য উৎসাহিত করে গেছেন। রসুলুলাহ (স:)Ñএর ইন্তিকালের পরও ৩০ বছর এ দিবসটি ইসলামের শ্বাশ্বত বিজয়ের শুকরানা রূপে রোজা পালনের পবিত্র অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিপালিত হয়েছে।
৬১ হিজরীর ১০ই মহররম মুসলিম জাতির ইতিহাসে সংযোজিত হল এক হৃদয় বিদারক কাহিনী, যা আশুরাকে অধিকতর তাৎপর্যময় করে তুলেছে। ১০ই মহররম কারবালা প্রান্তরে রসুল (স:)-এর প্রিয়তম দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা:) ইয়াযিদের সেনাবাহিনীর হাতে করুণ ভাবে শাহাদত বরণ করেন। হক প্রতিষ্ঠার আদর্শ সিপাহ সালার শাহাদতে হকের উত্তম নজির স্থাপনের প্রয়োজনে অপূর্ব আত্ম ত্যাগের মাধ্যমে এ দিবস টিকে মুসলিম জাহানের কাছে অধিকতর মর্যাদাবান করে তুলেছেন।
আশুরার তাৎপর্য খুঁজতে আমাদেরকে শুরুতেই ফিরে যেতে হবে হজরত নূহ (আ:)-এর ধৈর্য পরীক্ষার দীর্ঘ বছর গুলোর ইতিহাসে। দীন প্রচারের আন্দোলনের বিরোধিতা চলতে থাকলে এক পর্যায়ে হজরত নূহ (আ:) আল্লাহর দরবারে বিরুদ্ধবাদীদের ব্যাপারে অভিযোগ পেশ করলেন, “আমি এদেরকে দিবা রাত্রি দলবদ্ধ ভাবে ও পৃথক পৃথক ভাবে প্রকাশ্যে ও গোপনে সার কথা সর্বতো ভাবে পথে আনার চেষ্টা করেছ্ িকখনও আজাবের ভয় প্রদর্শন করেছি, কখনও জান্নাতের নেয়ামত রাজীর সুসংবাদ দিয়েছি, কিন্তু তারা কিছুতেই কর্ণপাত করেনি।” এমন এক নৈরাজ্যময় অবস্থায় হজরত নূহ (আ:) দোয়া করলেন, “হে আমার পালনকর্তা! আপনি পৃথিবীতে কোন কাফের গৃহবাসীকে রেহাই দেবেন না। যদি আপনি তাদেরকে রেহাই দেন, তবে তারা আপনার বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল পাপাচারী ও কাফের। তাদের গোনাহ সমূহের কারণে তাদেরকে নিমজ্জিত করা হয়েছে, অতঃপর দাখিল করা হয়েছে জাহান্নামে। পক্ষান্তরে নূহ ও তাঁর প্রতি সম্মান কারীদেরকে আল্লাহ পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করলেন আল্লাহর জমিনে মহররম মাসের ১০ তারিখে।
দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নূহ (আ:)-এর ন্যায় ধৈর্য ধারণ করতে পারলে খোদাদ্রোহী শক্তির পরাজয় হবেই, তারা পরিত্যক্ত হবেই। আশুরার ঐতিহাসিক বাস্তবতা মুসলিম জাতিকে এ আশ্বাস দিয়ে যায় যে, ইসলাম বিরোধীদের আস্ফালন যতই প্রচ- হোক না কেন সত্যের কাছে তাদের পরাজয় অনিবার্য। কালের প্রবাহে প্রতিটি আশুরা এ আশার আলো জ্বালিয়ে দেয় খোদার অনুগত বান্দাদের অন্তরে।
ফিরআউনের নির্যাতন ও সন্ত্রাসী আচরণ থেকে বনি ইসরাইল জাতি এ দিনে মুক্তি লাভ করল। এ দিনে শান্তিবাহী আনুগত্যশীল মুমিনের অন্তরে একটি মজলুম জাতির খোশখবরীর এবং এক চরম সন্ত্রাসী ও জুলুমশাহীর চির অন্ধকার ইতিহাস জাগিয়ে তোলে। খোদাদ্রোহী শক্তির প্রচ- বিরোধিতার মোকাবিলায় আল্লাহর উপর নির্ভেজাল নির্ভরশীলতা ও ধৈর্য একটি জাতির অন্তর প্রদেশে বিজয়ী শক্তি সৃষ্টি করে। ফিরআউনের ঔদ্ধত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনায় খোদার অংশীদারিত্ব ও ইবাদত বন্দেগীতে ইলাহ হওয়ার দাবি ও অহংকারের মোকাবিলায় হজরত মুসা (আ:) আল্লাহর নির্দেশে এগিয়ে এলেন। কুরআনের বাণী : “তোমরা উভয়ে ফিরআউনের কাছে যাও, সে খুব ঔদ্ধত হয়ে গেছে। অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথায় বল। হয়ত সে চিন্তা ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে।” তারা আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক ফিরআউনকে বললেন, “আমরা উভয়ে তোমার পালন কর্তার প্রেরিত রসুল। অতএব আমাদের সাথে বনি ইসরাইলদেরকে যেতে দাও এবং তাদেরকে নিপীড়ন করো না। কিন্তু ফিরআউন হজরত মুসার এ আহ্বানে সাড়া দিল না বরং আরও ঔদ্ধত্ব প্রকাশ করল। আল্লাহ হজরত মুসার নেতৃত্বে বনি ইসরাইলকে মুক্তি দিলেন, বিপরীতে ফিরআউন ও তার সঙ্গীরা নীল নদে কঠিন আজাবে নিমজ্জিত হল। ইসলামের এই শাশ্বত বিজয়ের উৎসবে যোগ দিলেন মুসা (আ:) থেকে বিভিন্ন নবী ও রসুল। শেষ পয়গম্বর হজরত মুহম্মদ (স:) আশুরার এই বিজয় উৎসব পালনের জন্য রোজা পালনের উপদেশ দিলেন। রসুল (স:) আল্লাহর শুকরিয়া পালনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেন সিয়াম পালন যা উচ্চতম ইবাদতের একটি পবিত্রতম রূপ। মুসলিম জাতি আজও আশুরা এলে সেই বিজয়ী চেতনার আলোকে উদ্দীপ্ত হয়। তারা বজ্র কঠিন শপথ গ্রহণ করে বাতিলের মোকাবিলায় দাঁড়াতে, নির্যাতিত মানবতাকে নিপীড়নের বজ্র মুঠি থেকে মুক্তি দিতে।
নিপীড়নের বজ্র মুঠি শিথিল হতে পারে ‘খিলাফত আলা মিন হাজিন নবুওয়ত’- নবুয়তী আলোকে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। হজরত মুসা (আ:)-এর উত্তরসুরি হজরত হোসাইন (রা:) রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মোকাবিলায় খিলাফত প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জাতির এক ক্রান্তি লগ্নে। রাজতন্ত্রের মানসপুত্র ইয়াযিদ হজরত হোসাইনের উন্নত শির তলোয়ারের আঘাতে ধুলায় ভূলুণ্ঠিত করে দিলেন এই ১০ই মহররমে। আর এ ভাবেই আশুরার বিভিন্ন ঘটনার সাথে হজরত হোসাইনের শাহাদতের ঘটনার নব সংযোজন হল শাহাদতের জজবার অফুরন্ত উৎস হিসেবে।
রসুল (স:) পূর্ব যুগে এবং রসুল উত্তর ৬০ হিজরী পর্যন্ত যে চেতনায় আশুরা পালিত হত তার সাথে যোগ হল ৬১ হিজরীর ১০ই মহররমে কারবালা প্রান্তরে হজরত হোসাইন (রা:) এবং তাঁর সঙ্গীদের শাহাদতের চেতনা। আজ তাই আশুরার আগমন ঘটে হজরত নূহ (আ:) ও হজরত মুসা (আ:)- এর মাধ্যমে ইসলামের বিজয়ের আনন্দ বার্তা নিয়ে। ইসলামের বিজয়ের জন্য প্রয়োজন বিরাট আত্ম ত্যাগও হোসাইনী শাহাদতের অনুপ্রেরণা। এই অনুপ্রেরণা যোগায় আশুরা, তাইতো আশুরা মুসলিম জাহানের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র দিন।
ইয়াওমে আশুরার আগমনে মুসলিম জাতির শহীদি চেতনা নবায়ন হওয়ার কথা। যে শহীদি জজবা পয়দা করার কথা তা যেন মুসলিম হৃদয় থেকে সঙ্গোপনে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। যে হক প্রতিষ্ঠার জন্য হজরত হোসাইন (রা:) তাঁর পরিবার বর্গসহ শাহাদতের পেয়ালা পান করলেন, সে সত্য আজ মিথ্যার দাপটের কাছে পরাজিত হচ্ছে। সেই সত্য প্রতিষ্ঠার আগ্রহ হৃদয়ে পোষণ না করে শুধু আহলে বাইতের মহব্বতের ধারায় স্নাত হয়ে মুসলিম সমাজ বিজয়ের শীর্ষে পৌঁছতে ব্যর্থ হচ্ছে।
আশুরার আগমন ঘটে বিশ্বব্যাপী ইয়াযিদ চক্রান্তের ছড়ান বেড়াজাল ছিন্ন করার উদ্দীপনা নিয়ে। ঐ ছড়ান জালে জড়িয়ে পড়ে ছিল বিভ্রান্তরা। ইয়াহুদী নেতা আবদুল্লাহ ইবনে সাবাহ অনৈক্য ও সংঘাতের বীজ বপন করেছিল মুসলিম সমাজে। যার পরিনতি করুণভাবে ঘটে হজরত ওসমান (রা:)-এর শাহাদত এবং তার পরে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত খিলাফত ব্যবস্থার মোকাবিলায় ইসলামের কেন্দ্র ভূমি হেজাজ, ইরাক অন্যান্য স্থানে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। রসুল (স:) প্রতিষ্ঠিত ইসলামী হুকুমত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিলাসের কারণে দ্বিখ-িত হয়ে পড়ে।
সাধারণ মুসলমানদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইয়াযিদ চেপে বসলেন হেজাজ, ইরাক ও সিরিয়ার শাসন ক্ষমতায়। খিলাফতী ব্যবস্থা দ্রুত রূপ নিতে চলছিল স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে। এ অবস্থায় সারা দেশে গণঅসন্তোষ দেখা দিল। হেজাজ সহ ইরাকবাসীগণ এ অবস্থা খেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন বাধা সত্ত্বেও হজরত হোসাইন (রা:)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করল। হজরত হোসাইন (রা:) এর প্রতি তাদের এ আনুগত্য ছিল স্বৈরাচার ও রাজতন্ত্রের বিরদ্ধে বিদ্রোহ এবং ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়ত’- এর প্রতি বাইয়াত বা আনুগত্য। ইয়াযিদ এ অবস্থা মেনে নিতে পারেনি। যার পরিণতিতে হজরত হোসাইন (রা:)কে অত্যন্ত অসহায় ও করুণ ভাবে কারবালা প্রান্তরে শাহাদত বরণ করতে হল।
হজরত হোসাইনের ব্যক্তির শাহাদত যেমন ছিল মর্মান্তিক তার চেয়ে অধিক বেদনাদায়ক ও মুসলমান জাতির জন্য ক্ষতিকর ছিল খেলাফত ব্যবস্থার হত্যা। ইয়াযিদ যে খেলাফত ব্যবস্থা চূর্ণ করে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। তাই হজরত হোসাইনের হত্যা ব্যক্তি হত্যা ছিল না বরং তা ছিল রসুল (স:) প্রবর্তিত এক মর্যাদাবান নীতি ও ব্যবস্থাপনার হত্যা। এ হত্যার দায় থেকে ইয়াযিদ কোন ভাবেই এড়াতে পারেন না। তাই আশুরা যেমন ছিল মুসা (আ:)-এর মাধ্যমে ইসলামের শাশ্বত বিজয়ের উৎসব তেমনি আশুরা হল ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থা সংরক্ষণের জন্য অনন্ত কালের জন্য এক সীমাহীন উদ্দীপনা ও উৎসাহের পবিত্র উৎস।
আশুরা মুসলিম জাতির আবে হায়াত। আজ দেশে দেশে খোদাদ্রোহী ও স্বৈরাচারী শাসককুল আল্লাহর বিধান মানার পরিবর্তে মানবতাকে ঠেলে দিচ্ছে বাতেলের পদপ্রান্তে। এ অবস্থায় প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব হল আল্লাহর রাহে জান কুরবানির আদর্শ হিসেবে হজরত মুসা ও হজরত হোসাইনের সংগ্রামী জীবনকে সামনে রেখে এগিয়ে চলা। শুধু মাত্র চোখের নোনা জলে বাতেল মিটে যায় না; চোখের নোনা জলের সাথে হৃদয়ের তপ্ত লোহু মিশ্রিত হলে যে প্রচণ্ড শক্তির সৃষ্টি হয় তা ই পারে বাতেলের মস্তককে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে।