॥ মুসফিকা আনজুম নাবা ॥
মাদকাসক্তি একটি জৈব-মানসিক অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তির জীবনপরিক্রমা মাদক দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং বিরতিহীনভাবে মাদক গ্রহণের ফলে ব্যক্তির মধ্যে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, মাদক গ্রহণ বন্ধ করলে তার মধ্যে এমন উপসর্গ দেখা যায়, যাতে বারবার মাদক গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তি; মাদক নির্ভরতা থেকে একটি স্বতন্ত্র ধারণা, যা নেতিবাচক পরিণতি জানা সত্ত্বেও ব্যক্তির জন্য বাধ্যতামূলক, অনিয়ন্ত্রিত মাদকের ব্যবহার হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। আসক্তি-সৃষ্টিকারী মাদক এমন ধরনের মাদক যা কখনো মস্তিষ্কে আনন্দদায়ক অনুভূতির জন্ম দেয়; সৃষ্টি করে উম্মাদনা। পাশাপাশি ব্যক্তিকে বারবার মাদক গ্রহণে উদ্বুদ্ধ ও বাধ্য করে। যা ব্যক্তির জীবনীশক্তি হ্রাস করতে করতে এক সময় ধ্বংসের মুখোমুখি দ্বার করায়।
একথা কারো অজানা নয় যে, আমাদের দেশে মাদকের বিস্তার ও মাদকাসক্তি এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইদানিং উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকাসক্তির ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। যা আমাদের নতুন প্রজন্মকে রীতিমত ধ্বংসের মুখোমুখি দ্বার করিয়েছে। বস্তুত, একটি সুশিক্ষিত জাতি তৈরি হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ এটির সর্বোচ্চ স্তর, যেখানে দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরা পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে যে, এসব মেধাবী উচ্চ শিক্ষার্থীরাই মাদকের ছোবলে আক্রান্ত হচ্ছে। শুধু তরুণদের মাঝে নয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তরুণীদের মাঝেও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে মাদকের বিস্তার। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠেছে মাদক বিস্তারের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা অভয়ারণ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুলিশের ভয় না থাকায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীরব ভূমিকা ও উদাসীনতার কারণেই ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে মাদক। মাদকাসক্ত অনেক শিক্ষার্থী জড়িয়ে পড়ছে সহিংসতায়। কারো কারো শিক্ষা জীবন অসমাপ্ত থাকছে। শুধু স্কুল-কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় নয় বরং বাংলাদেশে এমন কোনো পেশা নেই, যে পেশার মানুষ মাদকাসক্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতা মাদক ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তারাও জড়িত এর সঙ্গে। এ কারণে অভিযানে মাদক বহনকারীরা ধরা পড়লেও আসল গডফাদাররা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাদক নির্মূল করতে হলে সরকারের পাশাপাশি সবার সদিচ্ছা থাকতে হবে। এর সরবরাহ শতভাগ বন্ধ করতে হবে। একই সাথে গড়ে তুলতে হবে প্রবল সামাজিক আন্দোলন। অন্যথায় মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করা যাবে না।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কঠোর নির্দেশনা থাকলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বরং যতই দিন যাচ্ছে সার্বিক পরিস্থিতির ততই অবনতি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের জিরো টলারেন্স ঘোষণা, জরিমানা, গ্রেফতার করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বরং দিনের পর দিন মাদকের ব্যাপকতা বাড়ছে। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বন্যার মতো আসছে মাদক। ইয়াবা এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে এসে পৌঁছেছে। পাড়া-মহল্লায় ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে। ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র-ছাত্রীও এ থেকে মুক্ত নয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের বহু কর্মকর্তারা মাদকাসক্ত। এখন ডোপ টেস্ট করে চাকরিতে প্রবেশ করানো হয়। তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না মাদকের শ্রোত।
মাদকাসক্ত ব্যক্তির মধ্যে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি স্ট্রোকের হার সর্বাধিক। এছাড়া বদমেজাজ, চরম অবসাদ, আত্মহত্যার প্রবণতা, অসংলগ্ন ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, হ্যালুসিনেশন, ভুলে যাওয়া, দুর্বলচিত্ততা এবং হতাশা ইত্যাদি মানসিক বিকারের শিকার হয়। মাদক প্রাপ্তির সহজলভ্যতা মাদক বিস্তারের অন্যতম কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিনিয়রদের প্ররোচনায় অনেক নবীন শিক্ষার্থীরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। একের পর এক ব্যয়বহুল মাদকের সঙ্গে যুক্ত হতে হতে মাদকাসক্ত হয়ে কেউ কেউ হয়ে যান মানসিক ভারসাম্যহীন। পড়াশোনার সঙ্গে বিচ্ছেদও ঘটে। স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীরা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে কৌশলে কোকেন, গাঁজা, মদ, মারিজুয়ানা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, হিরোইন, প্যাথিডিন, সিসা, সিবিক্সের মাধ্যমে নেওয়া মাদক, ঘুমের ওষুধ, এলএসডি ইত্যাদি মাদকদ্রব্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ ও বিস্তার করায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রেণীর শিক্ষক-কর্মচারীও এর সঙ্গে জড়িত।
বড় ক্যাম্পাসগুলোতে বহিরাগতরা সন্ধ্যা হলেই মাদকের আসর বসায়। মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীদের ৭০ শতাংশই বন্ধুদের প্ররোচনায় শুরু করেন। তারপর একে একে ব্যয়বহুল প্রাণঘাতী মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। এছাড়া এন্টি সোশ্যাল পার্সোনালিটি, শৈশব বিকাশে সমস্যা, পারিবারিক কোলাহল মাদকাসক্ত হওয়ার জন্য দায়ী। অনেকে আবার মাদক গ্রহণকে স্মার্টনেস মনে করে। মাদকাসক্তদের মধ্যে নিষ্ঠুরতার কার্যক্রম বেশি। তারা মাদকের টাকা জন্য পিতা-মাতাকে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, মাদকাসক্তি রুখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক ও সুশীল সমাজসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যমঞ্চে গড়ে তুলতে হবে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন এবং ব্যাপকভিত্তিক আত্মসচেতনতা। তাহলেই মাদকের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে।
দেশে মাদক ও মাদকাসক্তির বিস্তাররোধে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি মাদকদ্রব্যের বিস্তাররোধে খুব একটা সফল হতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে বলা হচ্ছে, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতারও করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও বন্ধ হচ্ছে না সর্বনাশা মাদকের বিস্তার। বাস্তবতা হলো, মাদকের চাহিদা ও বিপণন বন্ধ না হলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আত্মসচেতন মানুষদেরকে ঘর থেকেই সচেতন হতে হবে। এক্ষেত্রে পিতা-মাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা দরকার। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই মাদকদ্রব্যের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে।
গবেষণায় প্রমাণিত যে, মাদকাসক্তদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি সর্বাধিক। তাদের নার্ভগুলো ড্যামেজ হয়ে যায়। ব্রেন ক্ষয় হয়ে যায়। ডিমেনশিয়া বা মতিভ্রম হয়। অল্প বয়সে নিউরোপ্যাথি রোগ। অর্থাৎ সে চলাফেরা করতে পারে না। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। মাদকাসক্তির কারণে এ ধরনের রোগ নিয়ে প্রচুর শিক্ষিত তরুণ রোগী হাসপাতালে আসছে বলে জানান তিনি। প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কার্যক্রম চলছে। কিন্তু তারপরও মাদক নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না এবং এর ভয়াবহতা ক্রমেই বাড়ছে। তবে বিষয়টি আমাদের জন্য মোটেই অসম্ভব নয়। আমাদের দেশে অতীতের অনেক উদাহরণ রয়েছে। আমরাই এইডস নিয়ন্ত্রণে মারাত্মক সক্ষম হয়েছি। এইডস হলে মানুষ মারা যায়-এ সচেতনতা দেশের জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। তাই মাদকের বিরুদ্ধেও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সর্বাত্মক অভিযান চালাতে হবে। জনগণকে সচেতন করে তুলতে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। কারণ, এমন কোনো পেশা নেই, যেখানে মাদকাসক্ত কর্মী নেই। এটি একটি নীরব ঘাতক। একই সাথে মাদক সীমান্ত দিয়ে আসার পথ বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে যারা আসক্ত তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ সকল মহলের সদিচ্ছা থাকতে হবে। জনগণের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর এ দুঃসাধ্য সাধন করা কোনভাবেই সম্ভব হবে না।
নতুন প্রজন্মের মাদকাসক্তি বর্তমান সমাজের একটি ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। মাদক শুধু শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না, বরং তরুণদের অপরাধমূলক কর্মকা-ে প্ররোচিত করে এবং মেধাবী ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয়। নানাবিধ কারণেই আমাদের নতুন প্রজন্ম মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। কৌতূহলবশত অনেক কিশোর-কিশোরী প্রথম মাদক গ্রহণ করে। বাবা-মায়ের মধ্যে কলহ, সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং মানসিক একাকীত্ব মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত আসক্তি অনেক সময় তরুণদের ডিজিটাল অনলাইন জুয়া ও অন্যান্য মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। হেরোইন, মেথামফেটামিন, ইয়াবা ও অন্যান্য সিন্থেটিক মাদক মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মেজাজ খিটখিটে হওয়া, আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলা এর উল্লেখযোগ্য কারণ। সন্তানকে শাস্তি না দিয়ে তাদের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে এবং তাদের কথা শুনতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- এবং সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে সন্তানদের আনন্দে রাখতে হবে। মাদকে জড়িয়ে পড়লে ভীতি প্রদর্শন না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বর্তমানে সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়াও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা এবং নৈতিক শিক্ষা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করে।
আসলে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চার অভাবেই তাদের মধ্যে মাদকাসক্তি একেবারে চরম আকারে পৌঁছেছে। ফলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে অবক্ষয়। দেশের অপরাধ প্রবণতাও এখন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই আমাদের নতুন প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে বাঁচাতে দেশের শিক্ষা কারিকুলামে ধর্মীয় ও আদর্শিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। উদ্বুদ্ধ করতে হবে মূল্যবোধ চর্চায়। অন্যথায় জাতির ভবিষ্যৎ নিমজ্জিত হবে অন্ধকারে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ফুড এন্ড নিউট্রিশন, কলেজ অব হোম ইকোনমিকস।