বর্তমানে দেশের আর্থিক খাত গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ এবং একইসাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এমন কিছু পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে, যা জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি করছে। বিশেষভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক ব্যাংকিং খাতকে অস্থির করে তুলেছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপি সরকার একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনটা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। অথচ প্রথাগতভাবে এ পদে অর্থনীতিবিদ, মুদ্রানীতি বিশেষজ্ঞ বা দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার আমলারা দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। মো. মোস্তাকুর রহমান একজন হিসাববিদ (এফসিএমএ) হলেও অর্থনীতি বা মুদ্রানীতি পরিচালনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তার নেই। এরপরও তাকে দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে বসানো হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তার মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের ৮৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এবং নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের আমলে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ছাত্র-জনতার দাবির মুখে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। এরকম বিতর্কিত একজন ব্যক্তিকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিভিন্ন শাখায় বিক্ষোভ হয় এবং আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ায় নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপও বৃদ্ধি পায়।
খুরশীদ আলমকে ঘিরে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাঁর স্ত্রী আফরোজা আক্তারের প্রতিষ্ঠান ‘এগ্রোকর্প লিমিটেড’ ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের পর খেলাপি হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একইসঙ্গে এস আলম গ্রুপের প্রভাব ও স্বার্থ রক্ষায় তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলেও বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া এস আলম গ্রুপের সঙ্গে কোনো ব্যক্তির ঘনিষ্ঠতা বা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ঘিরে অতীতে বিতর্ক, অনিয়ম কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, তাঁদেরই আবার দেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে বসানো হচ্ছে। এতে জনগণের কাছে এ বার্তা যাচ্ছে যে যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যদি এভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু ব্যাংকিং খাত নয়; বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। এরকম একটি সংকটজনক মুহূর্তে গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরি জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেট উত্থাপন করেন। ঘোষিত বাজেট নিয়ে বিরোধী দলগুলোই সমালোচনা করেছে তা নয়; বরং বাংলাদেশের শীর্ষ অর্থনীতিবীদেরাও এই বাজেটকে অতি উচ্চভিলাষী, বাস্তবতাবিবর্জিত বলে আখ্যায়িত করেছেন। জুলাই পরবর্তী সময়ে প্রতিটি সেক্টরেই জনগণ গুণগত সংস্কার প্রত্যাশা করেছিল। বাজেট তৈরি ও প্রস্তাবনাতেও জনগণ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন কামনা করেছিল। বাজেটের আগে থেকেই নানামহলে এই বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতেও হচ্ছে। কিন্তু ঘোষিত বাজেটে জনপ্রত্যাশার সামান্যই প্রতিফলিত হয়েছে।
বাজেটের ব্যাপারে অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবীদেরা আগে থেকেই অর্থবছরের সময়সীমা পুনর্বিন্যাস করার সুপারিশ করেছিলেন। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় অর্থবছর ৩০ জুন শেষ হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ ব্যয় ও কাজ সম্পন্ন করার জন্য বছরের শেষ দিকে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়। বাস্তবে দেখা যায়, জুন মাস বাংলাদেশের বর্ষা মৌসুমের সূচনাকাল। অথচ সড়ক, সেতু, ড্রেনেজ, ভবন নির্মাণসহ অধিকাংশ অবকাঠামোগত প্রকল্পের জন্য এটি সবচেয়ে অনুপযুক্ত সময়। ফলে বর্ষার মধ্যেই তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা দেখা যায়, যা কাজের গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জনসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করে।
এমন পরিস্থিতি শুধু প্রকল্পের মানের অবনতি ঘটায় না, বরং দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগও সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে অনিয়ম, অদক্ষ ব্যয় এবং অর্থ অপচয়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে বরাদ্দ খরচ করার প্রবণতা একটি অস্বাস্থ্যকর প্রশাসনিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে প্রকল্পের প্রকৃত ফলাফলের চেয়ে বরাদ্দ অর্থ ব্যয় করাই অনেক সময় প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত এসব বাস্তবতা বিবেচনায় অর্থবছরের সময়সীমা পুনর্বিন্যাস এখন একটি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী আলোচনার বিষয়। অর্থবছরের এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যা উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, দরপত্র, বাস্তবায়ন এবং তদারকিকে দেশের মৌসুমি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের মান বৃদ্ধি পাবে, শেষ মুহূর্তের ব্যয়চাপ কমবে, জনসম্পদের অপচয় হ্রাস পাবে এবং জবাবদিহিতা শক্তিশালী হবে। তাই অধিক কার্যকর, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ফলপ্রসূ উন্নয়ন ব্যয় কাঠামো প্রণয়ন করা জরুরি। অর্থবছরের সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি উন্নয়নের গুণগত মান বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস এবং জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় প্রয়োজন।
বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তথা এডিপি বাস্তবায়নও প্রতিটি সরকারের জন্যই বড়ো ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা হলো বছরের অধিকাংশ সময় প্রকল্পের অগ্রগতি ধীরগতির থাকা, আর অর্থবছরের শেষ দিকে এসে দ্রুত অর্থ ব্যয়ের চেষ্টা করা। এর ফলে অনেক প্রকল্পে কাজের প্রকৃত মান, কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি উপযোগিতার চেয়ে বরাদ্দ অর্থ খরচ করাই মুখ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মে-জুন মাসে ব্যয়ের অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে তাড়াহুড়ো, নিম্নমানের কাজ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিয়মের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সম্পুরক বাজেটও আমাদের এখানে একটি প্রহসনের নাম। এর অবসান হওয়া উচিত। সম্পূরক বাজেটের মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থবছরের মধ্যে অনুমোদিত বাজেটের বাইরে কোনো অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে তা সংসদের সামনে উপস্থাপন করা এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সে ব্যয়ের বৈধতা, যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা। অর্থাৎ এটি কেবল একটি আর্থিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সরকারি ব্যয়ের ওপর সংসদীয় নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
বাস্তবে দেখা যায়, সম্পূরক বাজেট অনেক ক্ষেত্রে অর্থবছরের একেবারে শেষ পর্যায়ে কিংবা ব্যয় সম্পন্ন হওয়ার পর সংসদে উপস্থাপিত হয়। ফলে যে ব্যয় ইতোমধ্যে হয়ে গেছে, যে অর্থ ইতোমধ্যে খরচ করা হয়েছে, সে ব্যয়ের ওপর সংসদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা পর্যালোচনার সুযোগ প্রায় থাকে না। সংসদ তখন ব্যয় অনুমোদনের পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং সংঘটিত ব্যয়ের পরবর্তী বৈধতা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এখানেই সমস্যা তৈরি হয়। কারণ বৈধ বা অবৈধ, ন্যায্য বা অন্যায্য, প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় যে ব্যয়ই হোক না কেন, অর্থ একবার খরচ হয়ে যাওয়ার পর তা ফিরিয়ে আনা বা বাস্তবিক অর্থে প্রতিরোধ করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে পূর্বেই সংসদীয় অনুমোদন গ্রহণের যে নীতি, তার কার্যকারিতা অনেকাংশে হারিয়ে যায়। এতে প্রশাসনের মধ্যে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে যে, ব্যয় করলে কোনো সমস্যা নেই কারণ পরবর্তীতে নিশ্চিতভাবেই অনুমোদন মিলবে। এ মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, বাজেট শৃঙ্খলার অবক্ষয় এবং আর্থিক অনিয়মকে উৎসাহিত করতে পারে। এমনকি জনগণের করের অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হলো, সে প্রশ্নেরও সন্তোষজনক উত্তর পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংসদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সম্পূরক বাজেট যদি এমন সময়ে উপস্থাপিত হয়, যখন অধিকাংশ অর্থ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে, তাহলে সংসদের সেই সাংবিধানিক ভূমিকা ক্ষুণ্ন হয়। জনগণের প্রতিনিধিদের মতামত, আপত্তি বা সংশোধনী তখন বাস্তব অর্থে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।
তাই সম্পূরক বাজেটকে অর্থবছরের শেষ মুহূর্তের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং প্রকৃত সংসদীয় আর্থিক তদারকির হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থবছর শেষ হওয়ার যথেষ্ট আগে সম্পূরক বাজেট উপস্থাপন, অতিরিক্ত ব্যয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান, সংসদীয় কমিটির কঠোর পর্যালোচনা এবং ব্যয় অনুমোদনের পূর্বে কার্যকর আলোচনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সম্পূরক বাজেটের বর্তমান চর্চা আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অনিয়ম ও দুর্বল জবাবদিহিতার জন্য একটি নিরাপদ পথ তৈরি করে দেবে, যার চূড়ান্ত ক্ষতি বহন করবে দেশের জনগণ।
তাছাড়া কর সংগ্রহের যে পদ্ধতি রয়েছে, তা ভীষণভাবে ত্রুটিপূর্ণ। যারা ট্যাক্স দেন তারা তিন ধরনের ট্যাক্স দেন। একটা ট্যাক্স ট্রেজারে (সরকারি কোষাগারে) জমা হয়, একটা কিছু ব্যক্তির পকেটে যায় (ট্যাক্স আদায়কারীদের একটি অংশ)। আরেকটা চাঁদাবাজদের পকেট যায়। এ কারণে ট্রেজারির ট্যাক্সটা তার নম্বর ভলিউমের দিক থেকে ছোট হয়ে আসে। অনেক ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা হলো, সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া করের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অনানুষ্ঠানিক ব্যয়, প্রশাসনিক জটিলতা এবং হয়রানির চাপও তাদের বহন করতে হয়। ফলে ব্যবসার প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং কর ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও কমে যায়।
কারণ করদাতারা যখন মনে করেন যে কর ব্যবস্থাটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক নয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই কর প্রদানের আগ্রহ কমে যায়। এতে করের আওতা সংকুচিত হয়, রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত মাত্রায় বৃদ্ধি পায় না এবং সরকারের উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর আদায় প্রক্রিয়াকে যদি সম্পূর্ণ ডিজিটাল, স্বচ্ছ, হয়রানিমুক্ত এবং দুর্নীতিমুক্ত করা যায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা আরও উৎসাহের সঙ্গে কর প্রদান করবেন। করদাতাকে সন্দেহের চোখে নয়, বরং রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কর ব্যবস্থায় সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, করের ভিত্তি সম্প্রসারিত হবে এবং রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ই এর সুফল ভোগ করবে।
সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের বাজেটকে আরও বাস্তবায়নযোগ্য, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করতে চাইলে বাজেট ঘোষণার আগে বিরোধী দলগুলোর সাথে পরামর্শ করার প্র্যাকটিস চালু করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এবার একটি নতুন ঘটনা ঘটেছে। বিরোধী দল সরকারের বাজেট ঘোষণার আগেই একটি ছায়া বাজেট ঘোষণা করেছে। উদ্দেশ্য ছিল, যাতে এ ছায়া বাজেট থেকেও সরকার ইতিবাচক কিছু পয়েন্ট দেশের বাজেট প্রণয়নে যুক্ত করতে পারে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি যা হতাশাব্যাঞ্জক। বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত যেহেতু একটি উদ্ভাবনী ও গঠনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, সরকারের তাতে সমর্থন দেয়া উচিত ছিল; তাতে অন্তত জনগণ স্বস্তি পেত। কিন্তু এবারও সরকার কেবলমাত্র নিজেদের বিবেচনায় দেশের বাজেট ঘোষণা দেয়ায় তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থেকেই গেল। আমাদের সরকারগুলো দলীয় গন্ডির বিবেচনার বাইরে গিয়ে সার্বিকভাবে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হতে পারছে না- এটুকু আক্ষেপও রয়েই গেল।