ড. শহীদুল ইসলাম

খাদ্য সম্পূরক (ফুড সাপ্লিমেন্ট) বর্তমানে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের ইতিহাস মূলত খাদ্য ও পুষ্টির ইতিহাস। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ উপলব্ধি করেছে যে শুধু পেট ভরানোই যথেষ্ট নয়, বরং শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দীর্ঘায়ুর জন্য প্রয়োজন সঠিক পুষ্টি। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দৈনন্দিন খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতায় খাদ্য সম্পূরক বা ফুড সাপ্লিমেন্টের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সম্পূরক শিল্পের বাজারমূল্য শত শত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে নয়।

খাদ্য সম্পূরক বলতে সাধারণত এমন পণ্যকে বোঝায় যা মানুষের স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে এবং শরীরকে অতিরিক্ত পুষ্টি সরবরাহ করে। এতে ভিটামিন, খনিজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, প্রোবায়োটিক, ভেষজ নির্যাস এবং বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন গর্ভবতী নারীর জন্য আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট, একজন বয়স্ক ব্যক্তির জন্য ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, একজন ক্রীড়াবিদের জন্য প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট কিংবা একজন নিরামিষভোজীর জন্য ভিটামিন বি-১২ সম্পূরক। এগুলো সাধারণত ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, পাউডার, সিরাপ, সফটজেল কিংবা বিশেষ পানীয় আকারে বাজারজাত করা হয়।

বাংলাদেশে খাদ্য সম্পূরকের ধারণা ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও এর শিকড় অনেক পুরোনো। গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘদিন ধরে মধু, কালোজিরা, মাছের তেল, বিভিন্ন ভেষজ এবং পুষ্টিকর উদ্ভিদজাত উপাদান স্বাস্থ্যরক্ষায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতিতেও এমন অনেক উপাদানের ব্যবহার রয়েছে যা আধুনিক খাদ্য সম্পূরকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে তৈরি আধুনিক খাদ্য সম্পূরকের বিস্তার মূলত বিংশ শতাব্দীতে ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের আবিষ্কারের পর শুরু হয়।

বিশ্বের ইতিহাসে একসময় স্কার্ভি, রিকেটস, বেরিবেরি এবং গলগণ্ডের মতো রোগ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন করেছিল। পরে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে এসব রোগের মূল কারণ নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি। যেমন স্কার্ভি হয় ভিটামিন সি-এর অভাবে, রিকেটস হয় ভিটামিন ডি-এর অভাবে এবং বেরিবেরি হয় ভিটামিন বি-১-এর অভাবে। এই আবিষ্কার মানবসভ্যতাকে একটি নতুন উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়-অনেক রোগের প্রতিরোধ শুরু হয় পুষ্টি থেকে। সেই উপলব্ধি থেকেই আধুনিক খাদ্য সম্পূরক শিল্পের জন্ম।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খাদ্য সম্পূরকের গুরুত্ব আরও বেশি। দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটলেও এখনও অপুষ্টি এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি-১২ এবং ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতিতে ভুগছে। বিশেষ করে নারী, শিশু এবং বয়স্কদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। একজন গ্রামীণ গর্ভবতী নারী যদি পর্যাপ্ত আয়রন না পান, তাহলে তিনি রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হতে পারেন, যা প্রসবকালীন জটিলতা এবং নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। একইভাবে, শহুরে জীবনযাপনের কারণে অনেক মানুষ পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পাওয়ায় ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিতে ভুগছেন, যার ফলে হাড় দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের খাদ্য সম্পূরক বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। একসময় যেখানে শুধু কয়েক ধরনের মাল্টিভিটামিন বা টনিক পাওয়া যেত, সেখানে এখন বাজারে শত শত ধরনের পণ্য রয়েছে। শিশুদের জন্য গ্রোথ সাপ্লিমেন্ট, গর্ভবতী মায়েদের জন্য মাতৃ পুষ্টি পণ্য, বয়স্কদের জন্য বোন হেলথ সাপ্লিমেন্ট, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ পুষ্টিকর ফর্মুলা, খেলোয়াড়দের জন্য প্রোটিন ও অ্যামিনো অ্যাসিডভিত্তিক পণ্য এবং সৌন্দর্যচর্চার জন্য কোলাজেন ও বায়োটিন সাপ্লিমেন্ট ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির সময় খাদ্য সম্পূরক শিল্প এক নতুন গতি পায়। মানুষ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক এবং বিভিন্ন হারবাল পণ্য কিনতে শুরু করে। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা দেখা যায়। অনেক পরিবার নিয়মিত খাদ্যের পাশাপাশি অতিরিক্ত পুষ্টি গ্রহণের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। যদিও সব ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সমান শক্তিশালী ছিল না, তবুও মহামারি মানুষের মধ্যে পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে নতুন সচেতনতা সৃষ্টি করেছে।

খাদ্য সম্পূরক শিল্পের বর্তমান বিপণন ব্যবস্থাও অত্যন্ত পরিবর্তিত হয়েছে। আগে চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টদের পরামর্শ ছিল প্রধান উৎস। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই খাতের সবচেয়ে শক্তিশালী বিপণন মাধ্যমগুলোর একটি। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকে প্রতিদিন অসংখ্য বিজ্ঞাপন, স্বাস্থ্যবিষয়ক ভিডিও এবং পুষ্টি বিষয়ক কনটেন্ট প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক ফিটনেস প্রশিক্ষক, পুষ্টিবিদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্ন সম্পূরক পণ্যের প্রচার করছেন। এর ফলে একদিকে মানুষ তথ্য পাচ্ছে, অন্যদিকে ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্যের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেক সময় দেখা যায় যে একটি সাধারণ মাল্টিভিটামিনকে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যেন এটি প্রায় সব ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান। আবার কিছু ওজন কমানোর সাপ্লিমেন্টকে ‘অলৌকিক’ সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যদিও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল। এ ধরনের প্রচারণা ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

তবে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে খাদ্য সম্পূরক মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। একজন গর্ভবতী নারী নিয়মিত ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করলে শিশুর জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি কমতে পারে। একজন বয়স্ক ব্যক্তি ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়াম গ্রহণ করলে হাড়ের ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়তা পেতে পারেন। একজন নিরামিষভোজী ভিটামিন বি-১২ সম্পূরক গ্রহণ করে স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা এড়াতে পারেন। একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদ পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণের মাধ্যমে পেশির পুনর্গঠন ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারেন। অর্থাৎ সঠিক ব্যক্তি, সঠিক পণ্য এবং সঠিক মাত্রা-এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে খাদ্য সম্পূরক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করতে পারে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শিল্পের গুরুত্ব কম নয়। বিশ্বব্যাপী খাদ্য সম্পূরক শিল্প বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল একটি বাজার। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সফলতা অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাদ্য সম্পূরক উৎপাদনে বিনিয়োগ করে, তাহলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে এবং দেশের স্বাস্থ্যশিল্প আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ভেষজ সম্পদ এবং কৃষিভিত্তিক কাঁচামাল ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবনী পণ্য তৈরি করা যেতে পারে।

তবে এই শিল্পের সামনে কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গুণগত মান নিশ্চিত করা। বাজারে নিম্নমানের, ভেজাল বা ভুল তথ্যসংবলিত পণ্য থাকলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে পণ্যের লেবেলে উল্লেখিত উপাদান এবং প্রকৃত উপাদানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানও মিশ্রিত থাকতে পারে। তাই শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, উন্নত পরীক্ষাগার সুবিধা এবং কার্যকর বাজার তদারকি অপরিহার্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। অনেক মানুষ মনে করেন যে কয়েকটি ক্যাপসুল বা ট্যাবলেট খেলেই সুস্থ থাকা সম্ভব। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। একটি সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক সুস্থতা ছাড়া কোনো খাদ্য সম্পূরকই দীর্ঘমেয়াদে কাক্সিক্ষত ফল দিতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি যদি প্রতিদিন উচ্চমাত্রার ভিটামিন গ্রহণ করেন কিন্তু একই সঙ্গে ধূমপান করেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য খান এবং শারীরিক পরিশ্রম না করেন, তাহলে শুধুমাত্র সম্পূরকের মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য অর্জন সম্ভব নয়।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায় যে খাদ্য সম্পূরক শিল্প একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টি বা পার্সোনালাইজড নিউট্রিশনের ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে একজন ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ, জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য অবস্থা, এমনকি জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তার জন্য নির্দিষ্ট খাদ্য সম্পূরক নির্ধারণ করা হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তি এবং স্মার্ট ডিভাইসের সমন্বয়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে যেখানে মানুষ তার স্বাস্থ্য তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক পুষ্টি পরামর্শ পাবে।

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সচেতনতা, শক্তিশালী ওষুধ শিল্প এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এই খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।

সর্বোপরি, খাদ্য সম্পূরক শিল্প কেবল একটি বাণিজ্যিক খাত নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সঠিক নীতি, বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই শিল্প বাংলাদেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। আগামী দশকে খাদ্য সম্পূরক শিল্প বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হবে- এমন সম্ভাবনা আজ আর কল্পনা নয়, বরং একটি বাস্তব সম্ভাবনা।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক।