গণঅভ্যুত্থানের মাস জুলাই, বিপ্লবের মাস জুলাই। ফ্যাসিস্টমুক্ত জুলাইয়ে এবার বাংলাদেশের মানুষ উপভোগ করলো বিশ^কাপ ফুটবল। এই ফুটবল নিয়ে অনেক কথা, আবেগ ও উত্তেজনার যেন শেষ নেই। বিশ^কাপ শেষে এসে ঠেকলো স্পেন ও আর্জেন্টিনায়। ফাইনাল খেলাটি কি শুধু খেলা ছিল, নাকি সেখানে যোগ হয়েছে আরো কিছু? বোদ্ধারা বলছেন, নানামাত্রা যুক্ত হয়ে এবারের বিশ^কাপ ফুটবল পরিণত হয়েছে এক মহাকাব্যে। মহাকাব্যের মোড়ক উন্মোচনের কাজটা না হয় একটু পরেই করলাম। কারণ, ফুটবলের আবহের মধ্যেই ‘সুপার এল নিনোর’ বার্তা দিয়ে গেল গণমাধ্যম। এর বার্তা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।

পত্রিকার শিরোনাম ‘স্পেনের হাতে বিশ^কাপ আনন্দের ঢেউ ফিলিস্তিনে’। এই শিরোনামে অনেক কথা বলা হয়েছে, সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার ইচ্ছে আছে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ে ১০৫ মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে আবার বিশ^কাপ জিতলো স্পেন। আর ঘটনাটি ঘটলো দীর্ঘ ১৬ বছর পর। স্পেনের মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, সেভিয়া, ভ্যালেন্সিয়ার সড়কে-রাজপথে লক্ষ্য করা গেল মহাউৎসব। বিশ^কাপের বিজয়োৎসব তো হবেই, সেটাই স্বাভাবিক। তবে তাৎপর্যপূর্ণ আরেক বিজয় উৎসব দেখা গেল স্পেন থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ধ্বংসস্তুপের এক জনপদে, যার নাম গাজা। যেখানে প্রতিদিন মানুষের ঘুম ভাঙে বোমার শব্দে। যেখানে খাবার ও পানির অভাবে বেঁচে থাকাটাই এক বড় যুদ্ধ। গাজার সেই মানুষরাই স্পেনের বিজয়ে উৎসব করছে। কেউ মোবাইলের ছোট পর্দায়, কেউ জেনারেটরের সীমিত বিদ্যুতে টেলিভিশন চালিয়ে, কেউবা স্থানীয় আয়োজনে একসঙ্গে খেলা দেখে বিজয়ের মুহূর্তে উল্লাসে ফেটে পড়েছে। ফলে প্রশ্ন জাগে, এমন উল্লাসের কারণ কী? আসলে তাদের উল্লাস শুধু ম্যাচের আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে যুক্ত ছিল কৃতজ্ঞতার দায়িত্ববোধও। যৌক্তিক কারণেই স্পেনের বিশ^কাপ জয়কে গাজার মানুষ নিজেদের বিজয় বলে ভেবেছে, আনন্দের ঢেউয়ে ভেসেছে। বিশ^রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় স্পেন কেবল একটি ইউরোপীয় ফুটবল শক্তি নয়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম সারির ইউরোপীয় দেশগুলোর অন্যতমও বটে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বারবার গাজায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক চাপ, কূটনৈতিক বিরোধ ও সমালোচনা সত্ত্বেও স্পেন তার অবস্থান থেকে সরে যায়নি। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষের কাছে ওদের এই অবস্থান শুধু কূটনীতি নয়, বরং এটি ছিল সংকটের সময় পাশে দাঁড়ানোর এক বড় প্রতীক। ফুটবলের ভূগোলে স্পেন একটি দল। কিন্তু গাজার মানুষের কাছে স্পেন একটি অবস্থানের নাম। এ কারণেই ফাইনালের আগে থেকেই গাজার বহু মানুষ প্রকাশ্যে স্পেনকে সমর্থন জানিয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ আল বোজম বলছিলেন, আমরা চাই স্পেন জিতুক, কারণ তারা আমাদের কথা বলেছে। গাজার অ্যাম্পিউটি ফুটবল দলের কোচ হাতেম আল-মাগরিবিও একই কথা বলেছেন অন্যভাবে-যারা কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ায়, তাদের সাফল্যে আনন্দ করা কৃতজ্ঞতারই অংশ।

ভিন্ন চিত্রও আছে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হার্ভিয়েল মিলেই নিজেকে বিশে^র অন্যতম দৃঢ় জায়নবাদী নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। বহুবার তিনি ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ফলে গাজার মানুষের কাছে বিশ^কাপ ফাইনালটি শুধু স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ছিল না; এটি ছিল দুই ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের চ্যালেঞ্জও বটে। অবশ্য গাজার মানুষের এই সমর্থনের বিষয়টি কখনোই আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের প্রতি বিদ্বেষ নয়। বরং তারা বলেছে, আর্জেন্টিনা বিশ^ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দল, আর এই দলের সুপার স্টার লিওনেল মেসি একজন কিংবদন্তি। কিন্তু সংকটের সময় যে দেশ মজলুমের পাশে দাঁড়িয়েছে, সমর্থনটা তাদের প্রতিই। শুধু সরকার নয়, স্পেনের ক্রীড়াঙ্গনের তারকারাও গাজার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল লা লিগা জয়ের শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিনের পতাকা প্রদর্শন করেন। কিংবদন্তি কোচ পেপ গার্দিওলাও গাজার মানবিক সংকট নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন। এসব চিত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে, সমর্থন ও ভালাবাসা বাড়িয়েছে।

এতক্ষণ আমরা ফুটবলে ছিলাম। ফুটবল মাঠের খবরাখবর জানলাম। তবে আমাদের পৃথিবীতে আরও মাঠ আছেÑরাজনীতির মাঠ, অর্থনীতির মাঠ, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মাঠ; এগুলোকে আমরা একেকটা অঙ্গন হিসেবেও বিবেচনা করতে পারি। আজকাল তো জলাবায়ু নিয়ে, বৈশি^ক উষ্ণায়ন নিয়ে, জীববৈচিত্র্যের সংকট নিয়েও বেশ আলোচনা হচ্ছে। এসবের গভীর প্রভাব রয়েছে মানবজীবনে। লেখার শুরুতে আমরা সুপার এল নিনোর কথা উল্লেখ করেছিলাম। এ বছর খাদ্যপণ্যের ওপর আর হাওয়া চক্র ‘সুপার এল নিনোর’ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ২০২৮ সাল পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিশ^জুড়ে চলবে একই অবস্থা। এমন সতর্কতা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে ইরান যুদ্ধ বিশে^র খাদ্যমূল্যকে গত তিন বছরের মধ্যেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। আর দ্বিতীয় ধাক্কা দিতে পারে বৈশি^ক উষ্ণায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত চরম আবহাওয়া ‘সুপার এল নিনো’।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো মূলত বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের ফলে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে উষ্ণ¯্রােত ছড়িয়ে পড়ার কারণে তৈরি হয়। এটি ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ ঘটনায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; যা তাপপ্রবাহ, বন্যা এবং ঝড়ো আবহাওয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, প্রবল ঝড় এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। আমেরিকার ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাট-মোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্টেশনের (নোয়া) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনোর চক্রটি বিশ^জুড়ে বন্যা ও খরার ঝুঁকি বাড়িয়ে ফসল উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে এটিকে ‘সুপার’ বা ‘গডজিলা’ এল নিনো বলা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিশ^জুড়ে পরিবারগুলো এখন আকাশছোঁয়া ব্যয়ের চাপে জর্জরিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ‘চরম এল নিনো’ এই চাপকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কার আশঙ্কায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, যার কারণে সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে বজায় রাখতে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এল নিনো ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে, কারণ এটি উচ্চমূল্য এবং সার ও জ¦ালানি সরবরাহের ঘাটতির সাথে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট যুক্ত করবে। ইউবিএস-এর বিশ্লেষকরা বলছেন , ‘সামান্য সরবরাহ বিঘœ ঘটলেও তা ঐতিহাসিক ধারার চেয়েও বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে।’ সাধারণ এল নিনোর কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের খরার ঝুঁকি বাড়ে; কিন্তু দক্ষিণ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে এবং উরুগুয়েতে বন্যা দেখা দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, নি¤œআয়ের দেশগুলো, যারা ইতোমধ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তÑ তারা আরও বেশি ভোগান্তির শিকার হতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর বিশ্লেষকরা বলছেন, এল নিনো ইতোমধ্যে ফসলের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, যার ফলে ভারতে বর্ষাকাল বেশ শুষ্ক থাকছে। কিছু অঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মাত্র ২৫ শতাংশ এবং মধ্য ভারতের কিছু অংশে ৫০ শতাংশ বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা গম, চাল এবং আখের সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।

জুলাই মাসে তো ফুটবলের একটি উন্মাদনায় ছিল বিশ^। অথচ বিশে^র বড় বড় বাস্তবতায় ফুটবল এতটা মনোযোগ না পেলেও চলতো। ‘সুপার এল নিনোর’ বার্তা হয়তো এখন আমাদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করবে। ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটছে না কেন। বিশ^জুড়ে উষ্ণায়ন, বন্যা ও খরার ঝুঁকি কেন? জীবনযাত্রার ব্যয় কেন আকাশ ছোঁয়া? এখন আবার সুপার এল নিনোর কারণে বিশে^ খাদ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকার আশঙ্কা। আমাদের জন্য এগুলো কোনো ভালো খবর নয়। আমাদের সরকার বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছেন তো? সামনে যে বড় চ্যালেঞ্জ।