সরকারের ঢালাও কাঁচাপাট রফতানি নিষেধাজ্ঞার কারণে খুলনার লাইসেন্সধারী প্রকৃত কাঁচাপাট রফানিকারকদের ব্যবসা হুমকির মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ থাকায় ব্যাংক ঋণ, গুদাম ভাড়া এবং অফিসের খরচ জোগাতে না পেরে অনেক ব্যবসায়ী আজ দেউলিয়া হওয়ার পথে। আন্তর্জাতিক বাজারে বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা ক্রেতাদের ধরে রাখতে না পারায় বাংলাদেশের কাঁচাপাটের ঐতিহ্যবাহী বৈশ্বিক বাজারটি এখন ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, স্লাইভারের মতো আড়ালে পাচার হওয়া পণ্য সিন্ডিকেট সুবিধা পেলেও, বৈধ ও নিবন্ধিত রফতানিকারকদের কোনো বিকল্প সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এদিকে খুলনা অঞ্চলের পাট ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হলো জুটপ্রেসগুলো (যেখানে কাঁচাপাট নির্দিষ্ট মাপে চাপ দিয়ে বেল তৈরি করা হয়)। কাঁচাপাট বিদেশে পাঠানো বন্ধ থাকায় খুলনার দৌলতপুরসহ বিভিন্ন এলাকার জুটপ্রেসগুলো মাসের পর মাস সম্পূর্ণ অচল ও তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। এর সরাসরি আঘাত এসেছে এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার প্রেস শ্রমিক এবং দিনমজুরদের ওপর। জুটপ্রেসগুলো বন্ধ থাকায় কাজ হারিয়ে তীব্র কর্মসংস্থান সংকটে পড়েছেন এই অঞ্চলের শ্রমিকরা। বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় বহু শ্রমিকের পরিবার অনাহার ও অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন, যার ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে।

সরকার দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় কাঁচাপাট রফতানি বন্ধ রেখেছে। অথচ কাঁচাপাটকে নামমাত্র প্রক্রিয়াজাত করে জুট স্লাইভার রোলস বা স্লাইভার কাট (কাঁচা পাটের আশ) হিসেবে রপ্তানি করছে একটি চক্র। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোতে তারা এটিকে পাটজাত পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। স্লাইভার রোলসকে পাট দেখিয়ে ১০ শতাংশ হারে মোটা অঙ্কের সরকারি প্রণোদনা বা ভর্তুকিও তুলে নিচ্ছে তারা। এটিকে দেশের পাট খাতের জন্য এক অভিনব ‘বাণিজ্যিক প্রতারণা’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কাঁচাপাট রফতানি বন্ধ থাকায় দেশের প্রধান পাট বাণিজ্য অঞ্চল খুলনার শতভাগ রফতানিমুখী কাঁচাপাট নিয়ে ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছেন। রফতানি বন্ধ থাকায় খুলনার জুটপ্রেসগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। যার ফলে হাজার হাজার পাট শ্রমিক কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বাংলাদেশ জুট মিলস এ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) ও বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স এ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) নথিপত্র এবং রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত ১৪ মাসে দেশ থেকে প্রায় ২২ হাজার ৫৯৪ মেট্রিক টন স্লাইভার রোলস রপ্তানি করা হয়েছে। যেখানে মূল তৈরি পাটপণ্যের জন্য সরকার নির্ধারিত নগদ সহায়তা মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ, সেখানে আংশিক প্রক্রিয়াজাত এই স্লাইভারের ওপর দেওয়া হচ্ছে ১০ শতাংশ ভর্তুকি।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বাস্তবে কাঁচাপাটকে নামমাত্র প্রক্রিয়াজাত বা রোল করে জুট স্লাইভার নামে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় স্লাইভার দিয়ে কম খরচে চূড়ান্ত পণ্য বানিয়ে বিদেশি ক্রেতারা আন্তর্জাতিক বাজারে খোদ বাংলাদেশের তৈরি পণ্যের বিরুদ্ধেই এক বিপজ্জনক ও অসম প্রতিযোগিতা গড়ে তুলছে। দেশীয় সাধারণ পাটজাত পণ্যের উদ্যোক্তারা একে সরাসরি সরকারি অর্থের অপচয় ও দেশের পাটশিল্পকে ধ্বংস করার সুনিপুণ প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ জুট এ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এস এম সাইফুল ইসলাম পিয়াস বলেন, কাঁচাপাটকে মেশিনের মাধ্যমে আশ বানিয়ে পাটপণ্য হিসেবে রপ্তানি একটি প্রতারণা। কাঁচাপাট রফতানি বন্ধ রেখে রফতানিকারকদের পথে বসানো হচ্ছে। অন্যদিকে স্লাইভার রোলস রফতানির অনুমোদন দিতে বেসরকারি জুট মিল মালিকদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। প্রণোদনার নামে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব অপচয় হচ্ছে।

বাংলাদেশ জুট এ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির বলেন, খুলনার প্রকৃত কাঁচাপাট রফতানিকারকদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং বৈশ্বিক বাজার পুনর্দখলে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কাঁচাপাট রফতানির সুযোগ পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। কাঁচাপাট রফতানি বন্ধ থাকলে জুট স্লাইভার রপ্তানিও অবিলম্বে নিষিদ্ধ করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের মন্ত্রীর সঙ্গে আমরা কথা বলবো।