বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংস্কারের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। দেশের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের আকাক্সক্ষার সঙ্গে কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নেওয়া হবে না এবং জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হবে। সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তবে জনগণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। প্রয়োজনে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মাল্টিপারপাস হলে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং সব গণহত্যার বিচারের দাবিতে’ এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। প্রবন্ধ পাঠ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গত সাড়ে ১৭ বছরে দেশের মানুষ হত্যা, গুম, নির্যাতন, পঙ্গুত্ব ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছে। অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে জাতির জন্য একটি বড় সুযোগ বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত, শহীদ ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দলের সে দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা যাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দেশের জনগণের সঙ্গে বারবার প্রতারণা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছানোর পর জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়। এতে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে জনগণের বিচারবোধের ওপর আস্থা রাখতে হয়। জনগণকে অজ্ঞ বা অক্ষম মনে করার কোনো সুযোগ নেই। যারা জনগণের বিবেচনাবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, তারা প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দেশের তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে হবে। জুলাইয়ের আন্দোলন ও শহীদদের আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন বা অপমান করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি সবাইকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে আমরা নই। তবে জনগণের রায় ও জুলাইয়ের চেতনাকে অসম্মান করার চেষ্টা করা হলে দেশের তরুণ সমাজ তা মেনে নেবে না। তিনি বলেন, দেশ, জাতি ও জনগণের স্বার্থে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা সবসময় প্রস্তুত রয়েছি।
বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি, বিএনপি জুলাইয়ের আন্দোলন ও জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক ধারার বাইরে ঠেলে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক। জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বরং সুপরিকল্পিতভাবে সেই চেতনাকে দুর্বল করার নানা প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি বিএনপির প্রতি অভিযোগ করে বলেন, অতীতে আমরা বহু স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু আন্দোলনের পর ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি অনেক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ফলে বারবার আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এবার আমরা শুধু কারও ওপর নির্ভর করে বসে নেই; আমরা আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তুলছি। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে জনগণের এই ইস্পাত-কঠিন ক্ষোভ একসময় বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, আমাদের আন্দোলনের মূল দাবি একটাই- গণভোটের গণরায় অবশ্যই মানতে হবে। জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা উপেক্ষা করার কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক অধিকার কারও নেই। সরকার বা বিএনপি যত যুক্তিই দেখাক না কেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করব না। তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা ধারাবাহিকভাবে জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি তুলে ধরছেন। এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, আলোচনা হয়েছে; কিন্তু দুঃখজনকভাবে স্পিকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আজ আমি একটি নতুন দৃষ্টিকোণ উত্থাপন করতে চাই। এখানে অনেক সিনিয়র আইনজীবী, ব্যারিস্টার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক উপস্থিত আছেন। তাঁদের কাছে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন রাখতে চাই- যদি রাজনৈতিকভাবে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা হয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করা হয়, তাহলে এর বিরুদ্ধে কী কোনো কার্যকর আইনি প্রতিকার গ্রহণ করা সম্ভব? আমরা লক্ষ্য করছি, সরকার রাষ্ট্রপতির আদেশে নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ না করে সংসদে সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে শুধুমাত্র সংবিধান সংশোধনের নামে একটি বিল আনার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে- রাষ্ট্রপতির আদেশে নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ আইনগতভাবে কতটা বৈধ?
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি বলেন, বিএনপি ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করে জনগণকে আশ্বস্ত করেছিল যে তারা শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থারও মৌলিক সংস্কার চায়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বসার পর থেকেই রাষ্ট্রের কাক্সিক্ষত সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি ধীরে ধীরে আপত্তি জানাতে শুরু করে। মুখে তারা সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বিরোধিতা করেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা তাদের বলতে চাই, বাংলাদেশের জনগণ গণভোটে যে রায় দিয়েছে, সেই রায়ই সর্বোচ্চ। জনগণের রায়কে খ-িতভাবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই।
সভাপতির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলতে চাই, আপনার সরকার এ পর্যন্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যেগুলোর প্রতি আমরা সমর্থন জানিয়েছি। বিশেষ করে বিদেশ সফর এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে এবং সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থনও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করা হচ্ছে। আমি বলতে চাই, আমাদের জাতীয় স্বার্থই আমাদের কাছে সর্বাগ্রে। দেশের প্রয়োজনে যেখানে যাওয়া দরকার, সরকার সেখানে যাবে- এটাই হওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী, আমি আগেও বলেছি, আজও বলছি- চারদিকে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আমরা যদি আপনার সমালোচনা করি, তা প্রকাশ্যেই করি। কিন্তু আপনার আশপাশে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যারা প্রকাশ্যে নয়, গোপনে আপনার এবং দেশের ক্ষতি করছেন। তাদের কেউ কেউ বিদেশি অর্থ ও পরামর্শে পরিচালিত হয়। আমার মতে, বাংলাদেশে যারা বিদেশি স্বার্থে কাজ করছে, তাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া আপনার প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত। এতে আপনি যেমন উপকৃত হবেন, দেশও তেমনি লাভবান হবে।
তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবেও আপনাকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছি। আমি মনে করি, আপনার নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। আমাদের সমালোচনা ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়; দেশের কল্যাণের স্বার্থে। আমরা চাই, জনগণের দুর্ভোগ কমুক এবং দেশের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হোক। সবশেষে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই- পেনশন-সংক্রান্ত বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। অতীতে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত অনেক কর্মকর্তাকে পুনর্বহাল ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হলেও, পেনশনের ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ আছে। বিষয়টি মানবিক ও ন্যায়সংগত দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাই। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানবিকতা, সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপির সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার চৌধুরী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান এড. একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ, বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, জুলাই শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা আলহাজ শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক জনাব শহীদুল ইসলাম, আহত জুলাই যোদ্ধা কামরুল আহসান প্রমুখ।
উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর ড. হেলাল উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসাইন ও ড. আব্দুল মান্নান, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও মাহফুজুর রহমান সহ ১১ দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতৃবৃন্দ।