বিরোধী দলের সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বিদেশে পাচার হওয়া প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারকে বিশেষ ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৬তম দিনে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি জানান। এসময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
উল্লেখ্য, গত এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মহলের আলোচনা অনুযায়ী দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান একইসঙ্গে ব্যাংক লুটপাটে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা ও অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান।
সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া-সলঙ্গা) আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য এবারের বাজেটকে জনবান্ধব নয় এবং গরিবের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টিকারী বলে আখ্যায়িত করেন।
অর্থ পাচার ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা জোরদারে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনগণের আস্থা কমছে। দুর্নীতিবাজদের কোনো দল নেই, তারা দেশের শত্রু। তাই দলমত নির্বিশেষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ। অথচ ২০০৯ সালের শুরুতে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত আজ ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া আগামী কয়েক বছরে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বাজেটের সমালোচনা করে বিরোধী দলের এই সংসদ সদস্য বলেন, চাল, ডিম, মুরগিসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মুদি পণ্যে ভ্যাট আরোপের কারণে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষও বাজার থেকে পণ্য কিনতে গিয়ে ভ্যাট দিচ্ছেন। অর্থমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে চতুর্থ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে অর্থমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন। এর মানে বর্তমান বাজেট তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম নয়, আগামী তিন বছর মানুষকে কষ্টের মধ্য দিয়েই চলতে হবে। বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রাকেও অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উন্নয়ন বাজেটের ধীরগতির কথা উল্লেখ করে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ১১ মাসে এডিপির মাত্র ৪৮ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। বছরের শেষ এক মাসে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতির আশঙ্কা বেড়ে যায়।
পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিদেশে অবস্থানরত অন্য মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ এনে বিরোধী দলের এই সংসদ সদস্য বলেন, গত ১০০ দিনে শত শত হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। মানুষের জানমাল রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। তিনি দেশে ৮৩ লাখ মাদকসেবীর কথা উল্লেখ করে সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থার দাবি জানান।
প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, অতীতে নির্যাতিত কর্মকর্তারা এখনো বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বিতর্কিত ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। এ ধরনের দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে। সেইসঙ্গে সংস্কার প্রশ্নে জনগণের মতামতকে সম্মান জানিয়ে দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়া কওমি মাদ্রাসার ১২ থেকে ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর উন্নয়নে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানজনক ভাতার দাবি জানান তিনি। জুলাইয়ের শহীদ পরিবারের পাশাপাশি গত ১৬ বছরে রাজনৈতিক গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ভাতার ব্যবস্থা করারও জোর দাবি জানান জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।