৩০০ প্রজাতির দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি কমে এখন মাত্র ৭০ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে
সংকটে ঢাকার জীববৈচিত্র্য
মুহাম্মদ নূরে আলম
সারা বছর শত শত পানকৌড়ি, সাদা-কালো বক আর নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আনাগোনায় মুখর থাকত পুরো ঢাকার আশপাশ এলাকা। ভোরের আলো ফুটতেই আকাশ ছেয়ে যেত ডানায়, চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতো পাখির কলতান। প্রকৃতি যেন নিজেই এখানে আয়োজন করত এক অনন্য উৎসবের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উৎসব যেন থমকে গেছে। একের পর এক জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে পাখিদের নিরাপদ আবাস। এদিকে অতীতে ঢাকার প্রায় প্রতিটি এলাকাই ছিল সবুজে ঘেরা ও জলাভূমি বেষ্টিত। উত্তরা দিয়াবাড়ি, মিরপুর বেড়িবাঁধ, আমিনবাজার, গাবতলী, সাভার, পূর্বাচল, খিলক্ষেত এবং ডেমরা-সবুজবাগ এলাকার বিস্তীর্ণ জলাভূমিগুলো ছিল দেশীয় ও পরিযায়ী পাখিদের প্রধান স্বর্গরাজ্য। শীতকালে এসব এলাকার বিলে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি জলকেলি করত। রাজউক ও ঢাকা ওয়াসার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সমীক্ষায় দেখা যায়, গত ৩০ বছরে এসব অঞ্চলের প্রায় ৮০-৮৫% জলাভূমি ও নিচু জমি আবাসনের নামে বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। যেখানে একসময় পানির ওপর ভেসে থাকত জীবনের ছন্দ, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে কংক্রিটের বহুতল ভবন। ফলে পাখিরা তাদের চারণভূমি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই রূপকথা আজ কংক্রিটের নির্মম বাস্তবতায় বন্দি। জলাশয় গিলছে আবাসন প্রকল্প, বুক চিরে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ, আর আকাশ দখল করছে ধুলো আর বিষাক্ত ধোঁয়া। এক সময়ের পাখির স্বর্গরাজ্য ঢাকা আজ রূপ নিয়েছে পাখিশূন্য এক ভূমিতে। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের এই মরণকামড়ে বিপন্ন হচ্ছে ঢাকার জীববৈচিত্র্য। পাখি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ কর্মী ও সংগঠনগুলো সাথে এই বিষয়ে কথা বলে এইসব তথ্য জানা যায়। পাশাপাশি তারা এই বিষয়ে গভীব উদ্ভেগও প্রকাশ করেছেন।
পাখি ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত কয়েক দশকে ঢাকার পাখির প্রজাতি ও সংখ্যার মধ্যে এক বিশাল ও উদ্বেগজনক পরিবর্তন এসেছে। আজ থেকে চার-পাঁচ দশক আগেও ঢাকা ও তার আশেপাশের নদী, নালা, খাল, বিল এবং বনাঞ্চলে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ প্রজাতির দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির নিয়মিত বিচরণ ছিল। নগরায়ণের ফলে পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ এবং গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা মহানগরের অভ্যন্তরে নিয়মিতভাবে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। যার একটি বড় অংশই কাক, চিল, শালিক, চড়ুই এবং কবুতরের মতো নগরে কৃত্রিমভাবে মানিয়ে নেওয়া পাখি। ঢাকার বুক থেকে প্রায় ৫০টিরও বেশি প্রজাতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত বা উধাও হয়ে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শকুন (রাজশকুন ও বাংলা শকুন), বড় জাতের ঈগল, বিভিন্ন প্রজাতির পেঁচা, কাঠঠোকরা, ধনেশ, ডাহুক, বাবুই এবং বুনো হাঁস। একসময়ের চিরচেনা ঘুঘু পাখির ডাক এখন ঢাকা শহরে প্রায় শোনাই যায় না।
সূত্রে জানাযায়, একটি সুস্থ নগরীর জন্য মোট আয়তনের অন্ততঃ ২৫% বনভূমি বা সবুজায়ন থাকা আবশ্যক। ১৯৪০ থেকে ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা ও তার আশেপাশের (গাজীপুরের ভাওয়াল গড় ও সাভারের একাংশসহ) প্রায় ৩০% থেকে ৩৫% এলাকা ঘন বন জঙ্গল এবং প্রাকৃতিক গাছপালায় আচ্ছাদিত ছিল। সাম্প্রতিক রিমোট সার্ভে ও স্যাটেলাইট ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকার মূল শহর এলাকার সবুজ আচ্ছাদন বা গ্রিন কাভারেজ কমে এখন মাত্র ৭% থেকে ৮%-এ এসে ঠেকেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদ-ের চেয়ে অনেক নিচে। বড় বড় প্রাচীন বৃক্ষ কেটে ফেলার কারণে চিল বা ঈগলের মতো বড় পাখিরা তাদের বাসা তৈরির উপযুক্ত স্থান পাচ্ছে না।
ঢাকার জলাশয়, নদী ও খালের তুলনামূলক পরিসংখ্যান: বিগত কয়েক দশকে ঢাকার বুক থেকে যেভাবে নদী, খাল এবং প্রাকৃতিক জলাশয় উধাও হয়ে গেছে, তার পরিসংখ্যান অত্যন্ত ভয়াবহ। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এর দশকেও ঢাকার চারপাশ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা এই চারটি প্রবহমান প্রধান নদী দ্বারা বেষ্টিত ছিল, যার পানির গুণগত মান ছিল চমৎকার। তবে ২০২৬ সালের বর্তমান চিত্রে দেখা যায়, নদীগুলো মানচিত্রের অস্তিত্বে কোনোমতে টিকে থাকলেও ভয়াবহ দূষণ ও দখলের শিকার হয়ে আজ “বায়োলজিক্যালি ডেড” বা জলজ প্রাণীর বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। খালের ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ট্র্যাজেডি; একসময় ঢাকা জেলা ও মহানগরে প্রায় ৬৫টি প্রবহমান প্রাকৃতিক খাল থাকলেও বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি কর্পোরেশনের হিসাব মতে কাগজে-কলমে ৩৯ থেকে ৪০টি খালের অস্তিত্ব মেলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে সচল ও দখলমুক্ত খালের সংখ্যা ২০টিরও কম, আর বাকিগুলো পরিণত হয়েছে বক্স কালভার্ট কিংবা আবর্জনার স্তূপে।
একইভাবে রাজউকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেখানে অতীতে ঢাকা শহরে প্রায় ২,০০০-এর বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত পুকুর ছিল, সেখানে বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ১০০টির নিচে নেমে এসেছে। শুধু তাই নয়, বেগুনবাড়ি বিল, রামপুরা বিল কিংবা দিয়াবাড়ির মতো শত শত প্রাকৃতিক ডোবা ও প্লাবনভূমি, যা ছিল পাখিদের প্রধান চারণভূমি; তার প্রায় ৮৫ শতাংশই সম্পূর্ণ ভরাট করে ফেলা হয়েছে। সেসব প্লাবনভূমি ও জলাশয় আজ গুলশান, বনশ্রী, উত্তরা ও আফতাবনগরের মতো সুউচ্চ কংক্রিটের আবাসন এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে, যা নগরের প্রাকৃতিক জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং জীববৈচিত্র্যকে ঠেলে দিয়েছে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে; তার ৭টি কারণ উল্লেখ করেন। যেমন: অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ও প্লাবনভূমি ভরাট, বড় ও প্রাচীন বৃক্ষ নিধন, তীব্র শব্দ ও আলোক দূষণ, কীটনাশকের যত্রতত্র ব্যবহার, বায়ু ও পরিবেশ দূষণ, শিকার ও মানুষের অত্যাচার।
আশুলিয়া এলাকার বাসিন্দা সাংবাদিক শাহেদ মতিউর রহমান বলেন, ধীরে ধীরে জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে এখন সেখানে গড়ে উঠছে বসতি। তার সাথে তো আছে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের বালু ভরাট। এর ফলে পাখির সংখ্যা এতটাই কমে গেছে যে এখন আর তেমন একটা পাখি দেখা যায় না। তার স্মৃতিচারণে উঠে আসে এক অন্যরকম সকালের গল্প। তিনি বলেন, ভোর হলেই পাখির ডাকে ঘুম ভাঙত। তাদের খাবারেরও কোনো অভাব ছিল না। চারপাশে ছিল জীবনের প্রাচুর্য। শুধু স্থানীয়রাই নয়, বিকেল বেলায় শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমিনবাজার ও আশুলিয়া এলাকায় অনেক মানুষ ছুটে আসতেন পাখি দেখতে। কিন্তু এখন সেই দৃশ্যও অতীত। জলাশয় কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে পাখি, থেমে গেছে দর্শনার্থীদের আনাগোনাও। প্রকৃতির সেই হারিয়ে যাওয়া রূপ শুধু পরিবেশের অপুরনীয় ক্ষতিই নয়, মানুষের স্মৃতিতেও এক গভীর শূন্যতার দাগ কেটে যায়।
সাংবাদিক শাহেদ মতিউর রহমান আরও বলেন, ‘পাখির কলকাকলি হারিয়ে যাওয়ার মানে প্রকৃতির ছন্দে পতন ঘটা, নৈশব্দের ছায়া নেমে আসা।’ এই চিত্র কেবল আমিন বাজার বা আমার পৈত্রিক ভিটা আশুলিয়া এলাকার নয়, বরং গোটা ঢাকা শহর ও এর আশেপাশেই এখন আর পাখির দেখা পাওয়া যায় না। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন আর জলাশয় ভরাটের ফলে এই জনপদ হারাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক টুকরো নির্মল প্রকৃতি।
পরিবেশবিদ ও পাখি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি জলাশয় সংরক্ষণ, পাখির আবাস রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে খুব শিগগির এই অঞ্চল থেকে পাখির স্মৃতিটুকুও মুছে যেতে পারে। কোথায় গেল দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি তারা বলছেন, ঢাকার অদূরের জলাশয়গুলো একসময় ছিল দেশীয় পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এই জলাশয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি দেখা যেত পানকৌড়ি জলের নিচে ডুব দিয়ে মাছ শিকার করা। তাদের দক্ষতা সত্যিই বিস্ময়কর। পাশাপাশি সাদা বক ও কালো বক নীরবে দাঁড়িয়ে থাকত পানির ধারে, সুযোগ বুঝে শিকার ধরার অপেক্ষায়। এছাড়া ডাহুক পাখি তার স্বতন্ত্র ডাক দিয়ে জলাশয়ের চারপাশ মুখর করে তুলত।
তবে আসলেই পাখি কতটা কমেছে সে বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিলেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনিকোলজি, অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ বিভাগের বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ গবেষণাগার ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আ ন ম আমিনুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে অনেকেই বলেন, দেশে আগের মতো পাখি নেই। কিন্তু গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ছাড়া এমন মন্তব্য করা সঠিক নয়। কারণ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আসে যায় এবং পরিবেশ ও খাদ্যের প্রাপ্যতা অনুযায়ী স্থান পরিবর্তন করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে বকপাখির তিনটি ভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। সাধারণ মানুষ সাদা বককেই কেবল বক মনে করে। তবে অন্য দুই প্রজাতির বকের গায়ের রং অনেক সময় কচুরিপানা বা জলজ উদ্ভিদের সঙ্গে মিশে যায়, ফলে সহজে চোখে পড়ে না। এ কারণেই অনেকের কাছে মনে হয় বকপাখি আগের মতো নেই।’
বিজ্ঞানবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ফিজ.অর্গ’-এ ২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের সব কীটভুক পাখির মোট ওজন প্রায় ৩০ লাখ টন। এরা প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টন পোকামাকড় এবং অন্যান্য আর্থ্রোপড; যেমন সহস্রপদী (মিলিপিড) ও মাকড়সা খেয়ে থাকে। তবে নগরায়ণ ও পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে অনেক পাখি আবাসস্থল বদল করছে। পাখির খাবার থাকলেও শহরের উচ্চ শব্দদূষণ, পরিবহনের ধোয়া ও অতিমাত্রায় ধুলিদূষণের কারণে পাখিদের আনাগোনা কমছে। শুধু খাদ্য নয়, সংকট নিরাপদ পরিবেশেরও একসময় উত্তরা দিয়াবাড়ির জলাশয় ও জঙ্গলে অসংখ্য পাখি দেখা গেলেও বসতি গড়ে ওঠায় তারা অন্যত্র চলে গেছে। পরে সেই এলাকাতেও নগরায়ণ বাড়ায় আবার নতুন জায়গা খুঁজে নিয়েছে। শুধু খাদ্য নয়, নিরাপদ পরিবেশও পাখির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তুতন্ত্রে পাখির অপরিহার্য ভূমিকা পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর বর্তমান সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, আজকের নগরায়নের চাপে ঢাকা তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। একসময় চারপাশের চারটি নদীকে কেন্দ্র করেই ঢাকার বিকাশ ঘটেছিল। তখন নগর বিস্তারের পরিধি ছিল সীমিত। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে ঢাকা শহর পরিকল্পনাহীনভাবে বিস্তৃত হয়েছে। এই সম্প্রসারণের বড় একটি অংশই জলাশয় ভরাটের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। ফলে জলাশয় ও তার আশপাশের গাছপালা ধ্বংস হয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।