বছর খানেক হলো চুরি হয়েছে সেতুর বৈদ্যুতিক ক্যাবল। এরপর আর পুনস্থাপন করেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে জ্বলেনা সেতুর ৩৬টি সড়কবাতি। এভাবে অকেজো পড়ে থাকায় একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রাংশ। অন্যদিকে সন্ধ্যার পর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায় সেতুটি। চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। কখনও সড়ক দুর্ঘটনা, কখনও পথচারীরা ছিনতাইয়ের শিকার হন। এই সুযোগে মাদকসেবীরা নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালাচ্ছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী-যদুবয়রা সড়কের গড়াই নদীর ওপর নির্মিত পিসি গার্ডার সেতুটির এ চিত্র বর্তমান। অথচ ২০২৩ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা প্রতিটি বাতি স্থাপনে খুঁটি, তার, বাল্ব ও শ্রমিক বাবদ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা।
কুমারখালী উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গড়াই নদীর উপর ৮৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬৫০ মিটার পিসি গার্ডার নির্মাণ করে নেশনটেক কমিউনিকেশন ও রানা বিল্ডার্স। ২০২৩ সালের ২৬ জুন কাজ শেষে হস্তান্তর করা হয়। ২৮ জুন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। মাসে ২৫ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল গুনতে হয় সরকারকে। বিল বকেয়া থাকায় কয়েক মাস বন্ধ ছিল বাতি। এতে ৩৫ টি বাতি অকেজো হয়ে যায়। তখন অনেক লেখালেখি হলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারীতে ১৭টি বাতি পুনস্থাপন করা হয়। ২৬ জুলাই রাতে সেতুর চার লাখ টাকা মূল্যের ৬৫০ মিটার ক্যাবল চুরি হলে আর জ্বলেনি সড়ক বাতি।
সরে জমিন গিয়ে দেখা যায়, সেতুতে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেতুর দুইপাশে সাড়িবদ্ধ স্টিলের খুঁটিতে বাতি স্থাপন করা থাকলেও তা জ্বলছে না। ৩৬টি খুঁটির মধ্যে মাত্র চারটি খুটিতে জ্বলছে সোলার প্যানেলের বাতি। হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে যানবহন ও চালক। অসহ্য গরমে কিছুটা স্বস্তির জন্য এসেছেন উৎসুক জনতা। সেতুর ওপর ও আশপাশ এলাকায় বসেছে বেশকিছু ভ্রাম্যমাণ ও স্থায়ী দোকান।
এ সময় জোতমোড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা আক্ষেপ করে বলেন, বাতির নিচে অন্ধকার। কষ্টের কথা। শত কোটি টাকার সেতুতে লাইট থাকবেনা। এটা কর্তৃপক্ষের যে কতবড় উদাসীনতা এবং এর তদারকি করা যে কেউ আছে তা জানা নাই। রাত ১০টা বাজলেই মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। যারা চুরি করেছে তারা নিশ্চয় উড়ে আসেনি মঙ্গল গ্রহ থেকে। দুইপাশে সিসিটিভি থাকতেও তাদেরকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়না। লাইট না থাকায় সেতুর সৌদর্য নষ্ট হচ্ছে। চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে।
ঝালমুড়ি বিক্রেতা আলী হোসেন বলেন, সেতুটি একটি শান্তির জায়গা। দোকানপাট বন্ধ করে, কাজ শেষে ৮টার পর মানুষের সেতুতে ঘুরাঘুরি করতে আসবে। ব্যবসা করব। আর তখন ৮টা বাজলেই মানুষ চলে যায়। বেচাঁবিক্রি হয়না। সেতু চালুর সময় দিনের মতো লাইট জ্বলত। হাজার - বারোশ টাকা বেচাবিক্রি হতো। এখন অর্ধেকও হয়না।
ভ্যানচালক রেজাউল ইসলাম বলেন, রাতে সেতুর ওপর ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে। এ সুযোগে ছিনতাইকারীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রায়ই ভ্যান-রিকশা ছিনতাই হচ্ছে। বাতি থাকলে এ সমস্যা হতো না। এছাড়া অন্ধকারে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ফের বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করা দরকার। তিনি বলেন, সেতু আরম্ভ হওয়ার ৬ - ৭ মাস লাইট গুলো ভালো ছিল। মানুষ গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরাফেরা করত। এখন অন্ধকারে মানুষ আসেনা।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মুঠোফোনে বলেন, ২০২৩ সালের ২৬ জুন কাজ শেষে সেতুটি হস্তান্তর করা হয়েছে। এক বছর পর্যন্ত মেরামতের সময় ছিল। সে সময়ও শেষ হয়েছে। এখন এলজিইডি দেখবে বিষয়টি।
এবিষয়ে কুমারখালী এলজিইডির প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, বিল বকেয়া থাকায় কিছুদিন বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ ছিল। এতে বেশ কিছু বাতি নষ্ট হয়েছে। পরে বকেয়া পরিশোধ করে ১৭ টি বাতি পুনস্থাপন করে আলোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ৪ লাখ টাকা মূল্যের দামি ক্যাবল চুরি হওয়ায় সব বাতি বন্ধ রয়েছে। ক্যাবল কেনা ও বাতি জ্বালানোর জন্য বরাদ্দ চেয়ে চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
কুমারখালীর ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, জনস্বার্থে ইতিমধ্যে চারটি সোলার বাতি স্থাপন করা হয়েছে। নতুন অর্থবছরের বরাদ্দ পেলে বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হবে।