• দেশজুড়ে বিক্ষোভ সড়ক অবরোধ

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এইচএসসি, আলিম ও সমমান পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড় ও উত্তরার বিএনএস সেন্টার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পরীক্ষার্থীরা। সকাল থেকে সারা দিন ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ করে সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নেয় এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী তারা এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সরকারি বাংলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, লালমাটিয়া স্কুল এন্ড কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন স্কুল এন্ড কলেজ, বিএফ শাহীন কলেজসহ ১২ থেকে ১৫ টি কলেজের শিক্ষার্থীরা এই অবরোধে অংশ নেন। তারা শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। পরে জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, যেসব কেন্দ্রে ভুলত্রুটি বা সমস্যা হয়েছে, সেখানে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। তিনি শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে পূর্বের বক্তব্যের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করেন।

সন্ধ্যার পর সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান করা এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে সরিয়ে দেয় পুলিশ। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আন্দোলনরতদের সরিয়ে দেওয়া শুরু করে পুলিশ। শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটার পাশাপাশি ধাওয়া দিতে দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের। এসময় ছত্রভঙ্গ হয়ে যান শিক্ষার্থীরা। এর আগে সন্ধ্যা ৬টার দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সংলগ্ন বটতলার গেইটে অবস্থান নেন পরীক্ষার্থীরা। অ্যাভিনিউয়ের দুই পাশেই আটকে রাখার ফলে আসাদগেইট থেকে খামারবাড়ির দিকে এবং খামার বাড়ি থেকে আসাদ গেইট অভিমুখে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম তখন বলেন, শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে এসে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর সড়কে অবস্থান নিয়েছে, এর ফলে সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। সেখানে পুলিশের বাড়তি ফোর্স রয়েছে। সংসদ ভবনের সামনে অবরোধের আধা ঘণ্টা পর পুলিশ শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেওয়া শুরু করার পাশাপাশি তাদের দেওয়া ব্যারিকেডও সরিয়ে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে বিকাল সাড়ে ৫টায় জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দপ্তরে তার সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

দুপুরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কারণে সায়েন্সল্যাব, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি ও আশপাশের সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা। বিক্ষোভকারীরা এসময় ‘দফা এক দাবি এক, মিলনের পদত্যাগ’, ‘এক দুই তিন চার, মিলন তুই গদি ছাড়’, ‘আমি কে তুমি কে, ফার্মের মুরগি ফার্মের মুরগি’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে শোনা যায়। অবরোধকারী শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। দাবি আদায় না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়ারও ঘোষণা দেন তারা। টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবিতে সকাল থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও কঠিন প্রশ্ন করার অভিযোগও তুলেন। অভিন্ন প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে কঠিন হওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা। সায়েন্সল্যাবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলার মধ্যে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলো দেখার আশ্বাস দিয়ে তাদের পড়ার টেবিলে ফেরার অনুরোধ জানান শিক্ষামন্ত্রী। এইচএসসির পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ের ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বর পাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণার পর বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। সেগুলো হলো- অনতিবিলম্বে আজ সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে এবং অসংগতিপূর্ণ কথা-বার্তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে, যারা ১৩ জুলাই অস্বস্তিকর পরিবেশে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে এবং যারা করেনি- সব শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নিতে হবে এবং আগামীকালের অর্থাৎ ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে, পরীক্ষার নতুন রুটিন প্রকাশ করতে হবে এবং প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে।

সায়েন্সল্যাব মোড়ে তিন দফা ঘোষণা করেছিলেন ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মিরাজুল ইসলাম। সায়েন্সল্যাব থেকে হঠাৎ কেন জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত কাল সোমবার) থেকে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের পরেও আমাদের পক্ষে কোনো ঘোষণা আসেনি। তাই আমরা সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছি, যাতে তারা দেখেন শিক্ষার্থীরা কীভাবে সাফার (কষ্টভোগ) করছে। যারা পরীক্ষা দিতে পারেনি তাদের পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার কথা শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন-এরপরে আন্দোলন কেন করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মিরাজুল বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা আমরা মানি না। এর আগেও তিনি অনেক ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো কিছুই তিনি বাস্তবায়ন করেননি। তিনি যে ঘোষণা দিয়েছেন তার বাস্তবায়ন হবে কি না সে নিশ্চয়তা নেই। তাই আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে এই পদে যোগ্য মনে করছি না।’

সকালে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় এক ঘণ্টা অবরোধ করেন। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান করেন। এরপর তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যান। বেলা সোয়া একটার দিকে ভিসি চত্বরের সামনে থেকে তাদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। পরে শিক্ষার্থীরা পলাশীর মোড় হয়ে বকশীবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে যান। শিক্ষার্থীরা বেলা পৌনে তিনটার দিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন এবং ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে ইট ছোড়েন। গেটে ধাক্কাধাক্কি করেন। শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে সরে আবার সায়েন্স ল্যাব মোড়ের দিকে আসেন। বিকেল চারটার কিছু আগে তারা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। এ সময় বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী মো. সামির বলেন, কোথায় গিয়ে দাবি সঠিকভাবে তুলে ধরবেন, তা তারা বুঝতে পারেননি। এ কারণে টিএসসিতে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ বাধা দিয়েছে, হামলা করেছে এবং অনেকে আহত হয়েছেন। দাবি না মেনে নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

এদিকে রাজধানীর উত্তরা বিএনএস টাওয়ারের সামনে এবং ইসিবি চত্বরের উভয় পাশে সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলমান থাকায় ওই এলাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়কে এখনও যান চলাচল বন্ধ হয় হয়ে যায়। এছাড়া গুগল ম্যাপেও রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজটের চিত্র দেখা গেছে। গুলশান ট্রাফিক বিভাগের এক ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়, উত্তরা বিএনএস টাওয়ারের সামনে এবং ইসিবি চত্বরের উভয় পাশে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন চলায় সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ। এ কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এয়ারপোর্টমুখী অংশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যানবাহনের দীর্ঘ সারি এরই মধ্যে কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত পৌঁছেছে। নাগরিকদের সম্ভব হলে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করার অনুরোধ জানিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। একই সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে বলেও জানানো হয়েছে।

দুপুর পৌনে ১টার দিকে সায়েন্সল্যাব থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শিক্ষা ভবনের দিকে যাওয়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে পৌঁছালে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এরপর সেখানেই অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। পাশেই নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণে একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান চলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নেন। আশপাশে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও অবস্থান করছিলেন। একপর্যায়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির নেতাকর্মীদের নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।