জুলাই আন্দোলনের শহীদ হাফেজ মুহাম্মদ দীন ইসলাম বেপারির বাবা শাহ আলম বেপারি বলেন, জুলাই চলে যাচ্ছে আবার জুলাই আসছে। কিন্তু কোনরকম পরিবর্তন দেখছি না। আমরা সরকারের কাছে এটাই চাচ্ছি যে, দেশটার যেন পরিবর্তন হয়। বৈষম্য না থাকে। আমাদের ছেলেরা যে জন্য জীবন দিয়ে গেছে, আমরা চাই সেটাই। দেশটার পরিবর্তন হওয়া দরকার। আমরা যাতে সব সময় ন্যায়বিচারটা পাই। গুম খুনের বিচারটা সঠিকভাবে হয়েছে, সেটাই শুনতে চাই। আমরা সেই কথাটা জানতে পারলে শহীদের বাবা হিসেবে প্রাণটা শান্তি পেতো।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি আগামী জুলাই না আগামীকাল থেকে সামনের দিনগুলো যেন ভাল যায় সেটাই চাই। আমাদের ছেলেরা যেজন্য জীবন দিয়েছে, দেশের জন্য লড়াই করেছে; দেশটা যেন ভাল হয় সেটাই চাই। যে বৈষম্যগুলো চলছে আগামীতে যেন সেই বৈষম্যগুলো না থাকে; সরকারের কাছে আমি সেই আবেদন করি।

জুলাই থেকে কি শিক্ষা নেওয়া উচিত, এমন প্রশ্নের জবাবে জুলাই শহীদের এই বাবা প্রশ্ন রেখে বলেন, এদেশের ছেলে-মেয়েরা বা জনগণ কি না পারে ? এটাই শিক্ষা নেওয়া উচিত। আগামীতে যদি এমন কিছু হয়, তাহলে আগামীতে মানুষ আবার রাস্তায় নামবে। আবারো শিক্ষা দিবে।

শহীদ হওয়া ছেলের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার ছেলে মাদরাসায় পড়েছে। তাকে সবাই ভালো বলতো। সবাই তাকে ভাল জানতো। সে বাবা-মাকে খুব মান্য করতো। আমাদের কথার বাইরে কোন কাজ সে করতো না। বাবা-মায়ের কথামতো ভাল কাজ করতো। ভাল পথে চলতো। কিন্তু আমার ছেলে দেশের জন্য শহীদ হয়েছে। এ দেশটা ভাল হোক এটাই আমাদের কাম্য। আমার ছেলে ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশ চেয়েছে। আর মাদরাসার ছাত্র হিসেবেও সে সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতো। ন্যায়ের পক্ষে থাকতো। আমার ছেলে আল্লাহর কুরআনকে বুকে ধারণ করতো। ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে আগেও অনেকবার আমার ছেলে হেনস্তা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহপাক তার কাছে নিয়ে গেছে। হয়তো তাকে পছন্দ হয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় জিনিস। আমি চাই, এ দেশের জন্য আমার সন্তান শহীদ হয়েছে। ফ্যাসিস্ট মুক্ত করার জন্য। শেখ হাসিনার মতো আর কোন ফ্যাসিস্ট যেন কায়েম না হয়।

প্রসঙ্গত ২০২৪ ইং সালের ৫ তারিখ, যেদিন শেখ হাসিনা পালিয়েছে সেদিন যাত্রাবাড়িতে পুলিশের গুলীতে শহীদ হন দীন ইসলাম বেপারি। তরুণদের তাজা রক্তে যে নতুন সূর্য, তাদের স্মরণে যাত্রাবাড়ী মোড়ে গড়ে তোলা হয়েছে 'শহীদী স্মৃতি চত্বর'। সেখানে এ এলাকায় ৪৮ শহীদের মধ্যে জ্বল জ্বল করছে একটি নাম 'দীন ইসলাম'। যাত্রাবাড়ী থানার সামনেই খুব কাছ থেকে দ্বীন ইসলামকে গুলী করে পুলিশ। সন্তানের রক্তমাখা পোশাক আঁকড়ে থাকা মায়ের একটাই ইচ্ছা, মৃত্যুর আগে অন্তত একবার সন্তানের খুনির মুখোমুখি হওয়া। শহীদ দ্বীন ইসলামের মায়ের প্রত্যাশা, ছেলেকে যারা খুন করেছে তাদের বিচার যেনো দেখে যেতে পারি। যেন জানতে পারি কী অপরাধে তাকে মারা হয়েছে।

ওইদিন ছোট ভাইয়ের সামনেই প্রথম গুলীটা লাগে দ্বীন ইসলামের হাতে পায়ে। চোখের সামনে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর করুণ দৃশ্য সহ্য করতে পারেনি সামিউল। দিন দিন মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে সে। মায়ের বুক ফাটলেও কাঁদতে পারেন না বাবা। যাত্রাবাড়ীর চৌরাস্তায় তাই ছোট্ট দোকানটায় বসে স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান শাহ আলম ব্যাপারি। দেশ বাঁচাতে লড়তে চেয়েছিল দ্বীন ইসলাম। বলেছিল, যদি সুযোগ পাই, তবে দেশের জন্য শহীদ হবো। ছেলের শেষ নিঃশ্বাস পড়েছে যে মাটিতে, সেখানে কারণে-অকারণে এখন ঘুরে বেড়ান বাবা।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় ২০০২ সালের মে মাসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাল্যকাল থেকে অত্যন্ত ভদ্র, মিশুক এবং মেধাবী ছিলেন। সন্তানের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে শাহ আলম সন্তানকে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় ভর্তি করেন। মেধাবী হওয়ায় দ্রুত মাদরাসা শিক্ষায় সফলতা অর্জন করেন তিনি। কৃতিত্বের সাথে পবিত্র কুরআনুল কারীম সম্পূর্ণ মুখস্ত সম্পন্ন করেন।